ব্যাংকে টাকা রেখে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে গড়ে উঠেছে, নতুন সুদহারের বাস্তবতায় সেটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী পরিবারের সদস্য কিংবা চিকিৎসা ও সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করে আসা লাখো মানুষ এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে ব্যাংকে টাকা রেখেও প্রকৃত অর্থে তাদের সম্পদের মূল্য কমছে।
প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমাও পুনর্র্নিধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের পর বেশির ভাগ ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমাতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে আমানতের সুদের হারও।
প্রথম দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক মনে হতে পারে। কারণ, ঋণের সুদ কমলে শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগে উৎসাহ বাড়তে পারে, উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নতুন গতি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে যাচ্ছে। সেটি হলো, দেশের কোটি কোটি আমানতকারীর প্রকৃত আয় আরও কমে যাওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে নীতি সুদহার কমানোর পর ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার ৮ দশমিক ৫০ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনছে, যা আগে প্রায় ৯ থেকে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ, একজন আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাচ্ছেন, তা দিয়ে মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ক্ষতিও পূরণ করতে পারছেন না। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় নেতিবাচক প্রকৃত সুদহার (Negative real interest rate)।
এর অর্থ হলো, কাগজে-কলমে সুদ থেকে কিছু আয় হলেও বাস্তবে সেই অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকে রাখা সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
ঋণের সুদ কমানোর যুক্তি
বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদহার বজায় থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী খাতগুলো উচ্চ ঋণব্যয়ের কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছিল।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতি দেওয়া, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ঋণগ্রহীতাদের চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাই নীতি সুদহার কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেও মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে নীতি সুদহার কমিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমেনি। এমন পরিস্থিতিতে আমানতের সুদ কমে গেলে সঞ্চয়কারীদের প্রকৃত আয় আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রকৃত সুদহার কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণ মানুষ সাধারণত ব্যাংকের ঘোষিত সুদের হার দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা গুরুত্ব দেন প্রকৃত সুদহারকে। প্রকৃত সুদহার নির্ধারণ করা হয় আমানতের সুদ থেকে মূল্যস্ফীতির হার বাদ দিয়ে।
যদি কোনো ব্যক্তি ব্যাংকে ৯ শতাংশ সুদ পান, কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, তাহলে তাঁর প্রকৃত আয় ঋণাত্মক হয়ে যায়। অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে পাওয়া সুদ মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে না। এই কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আমানতের সুদ কমে যাওয়া অর্থনীতিবিদদের কাছে উদ্বেগের বিষয়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা কারা খাবেন
নীতি সুদহার কমানোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সেইসব মানুষের ওপর, যাদের প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস ব্যাংকের আমানতের মুনাফা। এর মধ্যে রয়েছেন- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা; পেনশনভোগী; প্রবাসী পরিবারের সদস্য; ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা; বিধবা ও একক নারী, যারা সঞ্চয়ের সুদের ওপর নির্ভরশীল; মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন।
ধরা যাক, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এক কোটি টাকা মেয়াদি আমানত রেখেছেন। আগে যদি তিনি ১০ শতাংশ সুদ পেতেন, তাহলে বছরে আয় হতো প্রায় ১০ লাখ টাকা। এখন সুদের হার ৯ শতাংশে নেমে এলে তাঁর বার্ষিক আয় কমে হবে প্রায় ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ, কেবল সুদ কমার কারণেই বছরে প্রায় এক লাখ টাকা আয় কমে যাবে। অন্যদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যদি আগের মতোই উচ্চ থাকে, তাহলে তাঁর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও দ্রুত কমবে।

আপাত স্বস্তি, নাকি ভবিষ্যতের ঝুঁকি?
স্বল্পমেয়াদে ঋণগ্রহীতারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব এতটা সরল নাও হতে পারে। যদি আমানতকারীরা মনে করেন ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত কোনো লাভ হচ্ছে না, তাহলে তারা বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারেন। কেউ জমি, কেউ সোনা, কেউ বৈদেশিক মুদ্রা, আবার কেউ অনানুষ্ঠানিক বিনিয়োগের দিকে যেতে পারেন। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ। ব্যাংকারদের মতে, গত কয়েক মাসে তুলনামূলক বেশি সুদ দেওয়ার কারণেই আমানত সংগ্রহে কিছুটা গতি ফিরেছিল। এখন সুদের হার আবার কমতে শুরু করলে সেই প্রবণতা কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, ব্যাংকের ঋণের প্রধান উৎসই হচ্ছে আমানত। ফলে সঞ্চয় নিরুৎসাহিত হলে তার প্রভাব শুধু আমানতকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার অর্থায়ন সক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।
সুদ কমার মূল্য দিচ্ছেন সঞ্চয়কারীরা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত আমানতনির্ভর। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হোক, কৃষিঋণ বিতরণ হোক কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, সবকিছুর প্রধান উৎস সাধারণ মানুষের ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ। তাই আমানতের প্রবাহে সামান্য পরিবর্তনও পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তকে শুধু ঋণের সুদ কমানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বরং প্রশ্ন উঠছে, যদি মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতেই নিরুৎসাহিত হন, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার অর্থ কোথা থেকে পাবে? এই প্রশ্নই এখন অর্থনীতিবিদদের আলোচনার কেন্দ্রে।
সঞ্চয়ের সংস্কৃতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও সীমিত। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবার বার্ধক্য, চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ব্যাংকে সঞ্চয় গড়ে তোলে। এই সঞ্চয়ের বড় অংশই আসে বেতনভোগী মানুষ, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, প্রবাসী পরিবার এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে।
কিন্তু যখন মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ পাওয়া যায়, তখন সঞ্চয়ের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ তখন স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে শুরু করে, ব্যাংকে টাকা রেখে যদি প্রকৃত আয় না-ই হয়, তাহলে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করাই কি ভালো নয়?
অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এটিকে বলা হয় “ডিসইনসেনটিভ টু সেভিংস” অর্থাৎ সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ। এর ফল তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও কয়েক বছর পর এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অর্থ কোথায় যেতে পারে?
ইতিহাস বলছে, যখন ব্যাংকে প্রকৃত মুনাফা কমে যায়, তখন মানুষ বিকল্প সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই বিকল্পগুলো হতে পারে- জমি ও ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ; স্বর্ণ ক্রয়; বৈদেশিক মুদ্রা ধারণ; শেয়ারবাজার; অথবা অনানুষ্ঠানিক উচ্চ মুনাফার বিনিয়োগ।
এর কিছু খাত উৎপাদনশীল হলেও অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ চলে যায় এমন সম্পদে, যা নতুন কর্মসংস্থান বা উৎপাদন বাড়াতে তেমন ভূমিকা রাখে না। এতে অর্থনীতিতে সম্পদের দক্ষ বণ্টন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শুধু সুদ কমলেই কি বিনিয়োগ বাড়ে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য হলো ঋণের ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, সুদহার বিনিয়োগের একমাত্র নিয়ামক নয়। একজন উদ্যোক্তা নতুন শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন তখনই, যখন তিনি ভবিষ্যৎ বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, করনীতি, অবকাঠামো এবং আইনি পরিবেশ সম্পর্কে আস্থা পান।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ব্যবসায়ীদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা ছিল- ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা, জ্বালানি ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা, নীতিগত অস্থিরতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং চাহিদার দুর্বলতা। এ অবস্থায় শুধু সুদহার অর্ধ শতাংশ কমলেই যে বিনিয়োগে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, সুদ কমানো তখনই কার্যকর হয়, যখন সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশও বিনিয়োগবান্ধব থাকে।
ব্যাংকের জন্যও সহজ সমীকরণ নয়
সাধারণভাবে মনে করা হয়, সুদ কমলে ব্যাংক লাভবান হয়। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একদিকে ঋণের সুদ কমে গেলে ব্যাংকের সুদ আয় কমে। অন্যদিকে আমানতের সুদও কমানো হয়, যাতে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। কিন্তু যদি আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন, তাহলে নতুন আমানত সংগ্রহ ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তখন ব্যাংকগুলোকে আবার উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নামতে হতে পারে।
বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক এখনও খেলাপি ঋণের চাপ, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই বাস্তবতায় আমানত প্রবৃদ্ধি কমে গেলে দুর্বল ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে তখনই, যখন মূল্যস্ফীতি স্পষ্টভাবে নি¤œমুখী হয়েছে এবং প্রকৃত সুদহার ইতিবাচক রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো অর্থনীতিগুলোতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদ কমানোর আগে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।
অন্যদিকে, যেসব দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আগেই সুদ কমানো হয়েছে, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয় কমেছে, মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি পুনরায় বাড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সিদ্ধান্তকে এককভাবে ভুল বা সঠিক বলার সুযোগ নেই। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একই সময়ে একাধিক লক্ষ্য পূরণ করতে হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু এই লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
যদি সুদ খুব বেশি রাখা হয়, তাহলে ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে বিনিয়োগ কমতে পারে। আবার সুদ খুব কমিয়ে দিলে সঞ্চয় নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
সুতরাং আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, আমানতের প্রবৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, এই তিনটি সূচকই হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়নের প্রধান মানদ-।
শুধু ঋণ নয়, সঞ্চয়ের দিকেও নজর দিতে হবে
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন টেকসই প্রবৃদ্ধি। সেই প্রবৃদ্ধির জন্য যেমন বিনিয়োগ প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী সঞ্চয়ভিত্তি। কারণ আজকের আমানতই আগামী দিনের শিল্প, কৃষি ও ব্যবসার অর্থায়নের মূল উৎস।
নীতি সুদহার কমিয়ে ঋণগ্রহীতাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি সেই সিদ্ধান্তের ফলে সঞ্চয়কারীদের আস্থা ক্ষুন্ন হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য পুরো অর্থনীতিকেই দিতে হতে পারে।
অর্থনীতির ইতিহাস বারবার একটি বিষয়ই মনে করিয়ে দেয়, বিনিয়োগের জন্য যেমন সস্তা ঋণ প্রয়োজন, তেমনি টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়কারীর আস্থা। সেই আস্থা অটুট রাখাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
লেখকঃ অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
আকিব আহমেদ 


















