মালদ্বীপকে নিয়ে সামুদ্রিক গবেষণার দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এখন আর কত বিদেশি গবেষক দেশটির জলসীমায় কাজ করেন, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো—নিজেদের সমুদ্র, প্রবালপ্রাচীর, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত জ্ঞানে মালদ্বীপের বিজ্ঞানীদের উপস্থিতি এত কম কেন?
মালদ্বীপের সামুদ্রিক বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা নিয়ে হানা আমির ও আয়শাথ সারা হাশিমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ এই প্রশ্নকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। ১৯৮৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ৬ হাজার ৪২৫টি রেকর্ড যাচাই করে ৪৬০টি পিয়ার-রিভিউড গবেষণাকে বিশ্লেষণে নেওয়া হয়। দেখা যায়, এসব গবেষণার ৪০ শতাংশেরও কমে কোনো মালদ্বীপীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং মাত্র ৩৪টি গবেষণায়—অর্থাৎ ৭ দশমিক ৪ শতাংশে—মালদ্বীপীয় বিজ্ঞানী প্রথম লেখক ছিলেন। এমনকি ৫২টি আবিষ্কারধর্মী গবেষণায় কোনো মালদ্বীপীয় লেখকই ছিলেন না।
এই পরিসংখ্যান বিদেশি গবেষকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু সমস্যাটিকে কেবল ‘বিদেশিরা এসে গবেষণা করে নিয়ে যাচ্ছে’—এই ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে আসল সংকটটি আড়ালে থেকে যায়। কম স্থানীয় প্রথম-লেখক থাকার ঘটনা আসলে মালদ্বীপের নিজস্ব গবেষণা ব্যবস্থার দুর্বলতারও আয়না। গবেষণায় কী অর্থ বরাদ্দ হয়, কোন ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, গবেষকদের কত দিন ধরে রাখা যায়, মাঠপর্যায়ের তথ্য কীভাবে বিশ্লেষণ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই কাজ কীভাবে বৈজ্ঞানিক প্রকাশনায় রূপ নেয়—সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই বাস্তবতা।
বিদেশি গবেষণার আধিপত্য বাস্তব, কিন্তু তার একটি সীমা আছে
প্রবালপ্রাচীর নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উচ্চআয়ের দেশগুলোর আধিপত্য নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রবালপ্রাচীর নিয়ে কাজেও উচ্চআয়ের দেশের গবেষকদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত বেশি। মালদ্বীপও এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়।
মাগুধুতে মিলানো-বিকোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং শতাধিক গবেষণাপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকাশনায় মালদ্বীপীয় সহলেখকের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক গবেষণা কাঠামোর অসমতা এখানে স্পষ্ট।
তবে এই ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। মালদ্বীপীয় গবেষকদের প্রকাশনা কেন কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি, আবার অন্য ক্ষেত্রে প্রায় অদৃশ্য?
এর উত্তর খুঁজতে হলে দেশের নিজস্ব গবেষণা অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে।
টুনা গবেষণা কেন সফল হলো
মালদ্বীপের সামুদ্রিক গবেষণায় মৎস্যসম্পদ, বিশেষ করে টুনা, একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ১৯৮০-এর দশকের মেরিন রিসার্চ সেকশন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই গবেষণার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। ১৯৯৬ সালের মৎস্যসম্পদ পর্যালোচনা থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের বাইক্যাচ গবেষণা এবং পরবর্তী ক্যাচ-রেট সিরিজ—এখানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে প্রতিভার পার্থক্য নয়, বরং কাঠামোগত কয়েকটি কারণ কাজ করেছে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক ইন্ডিয়ান ওশান টুনা কমিশনের সদস্য হিসেবে মালদ্বীপকে নিয়মিত জাতীয় প্রতিবেদন দিতে হয় এবং আঞ্চলিক বৈজ্ঞানিক পরিসরে সেই তথ্যের ব্যাখ্যা দিতে হয়। ফলে তথ্য সংগ্রহ একটি নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পোল-অ্যান্ড-লাইন মৎস্যশিল্পের টেকসই সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় গবেষণাকে বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনীয় অংশে পরিণত করা হয়েছিল। গবেষণা তখন আর কেবল একাডেমিক আগ্রহের বিষয় ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ইন্টারন্যাশনাল পোল অ্যান্ড লাইন ফাউন্ডেশনের মতো দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার ছিল, যাদের স্বার্থও ছিল মালদ্বীপীয় গবেষকদের নাম ও অবদানকে দৃশ্যমান করার মধ্যে।
অর্থাৎ একটি নিয়মিত বাধ্যবাধকতা, একটি আন্তর্জাতিক জবাবদিহির মঞ্চ এবং গবেষণায় স্থানীয় অংশীদারিত্বে আগ্রহী একটি প্রতিষ্ঠান—এই তিনটি উপাদান টুনা গবেষণাকে টেকসই করেছে। প্রবালপ্রাচীর গবেষণায় একই ধরনের কাঠামো তৈরি হয়নি।
প্রবালপ্রাচীরের সবচেয়ে বড় সমস্যা গবেষণার অভাব নয়
মালদ্বীপে প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৮৯ সালে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ প্রবালধসের পর ১৫টি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নিয়ে জাতীয় প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি গড়ে ওঠে। জাতীয় কাঠামো তৈরি হয়, ডেটাবেস গড়ে ওঠে, এমনকি ১৯৯৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রবাল আচ্ছাদনের একটি দীর্ঘ সময়সীমার তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।
তারপরও সেই বিপুল মাঠপর্যায়ের কাজের তুলনায় মালদ্বীপীয় বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত গবেষণার সংখ্যা খুব কম।
এখানেই সমস্যার প্রকৃত চরিত্রটি বোঝা যায়। সংকটটি সবসময় গবেষণা না হওয়ার নয়; অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা সম্পন্ন হওয়ার পর সেটিকে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে রূপ দেওয়ার জায়গাতেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
২০১৭ সালের একটি যৌথ স্ট্যাটাস রিপোর্টে জাতীয় প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্ষমতা ও অর্থের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ কাঠামো ছিল, পদ্ধতিও ছিল; কিন্তু সেই কাঠামোকে নিয়মিতভাবে চালানোর মতো মানবসম্পদ ও অর্থ ছিল না।
গবেষণার শেষ ধাপটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত
একটি ভালো গবেষণা প্রতিবেদন আর একটি প্রকাশযোগ্য বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ এক জিনিস নয়। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের পর প্রয়োজন বিশ্লেষণ, লেখার দক্ষতা, অভিজ্ঞ গবেষকের তত্ত্বাবধান, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা এবং পিয়ার রিভিউয়ের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে সংশোধন।
মালদ্বীপের গবেষণা ব্যবস্থায় এই ‘শেষ মাইল’-এর কাঠামো দুর্বল ছিল। তরুণ গবেষকের লেখা খসড়া নিয়ে একজন অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীর নিয়মিত কাজ করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। কোনো খসড়া ফেরত এলে কে কী সংশোধন করবেন এবং কখন করবেন—তারও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না।
ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কঠোর মান বজায় রাখার নামে অসম্পূর্ণ খসড়া পড়ে থেকেছে, কিন্তু সেই খসড়াকে সংশোধন করে প্রকাশযোগ্য করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হয়নি।
গবেষণায় কঠোরতা অবশ্যই দরকার। কিন্তু কঠোরতার ফল যদি সংশোধিত ও উন্নত গবেষণাপত্র না হয়ে ফেলে রাখা খসড়া হয়, তবে সেটি গবেষণার মান রক্ষা নয়; বরং গবেষণাকে প্রকাশনার বাইরে ঠেলে দেওয়া।

অগ্রাধিকারের বৈষম্যও বড় সমস্যা
কোন গবেষণা কর্মসূচিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তার প্রভাব শুধু বাজেটেই পড়ে না। অগ্রাধিকার পাওয়া দলটি নৌযান পায়, বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়, সম্মেলনে যেতে পারে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে এবং প্রকাশনায় এগিয়ে যায়।
অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম অগ্রাধিকার পাওয়া কর্মসূচির বিজ্ঞানীরা একই ধরনের মাঠকাজ করেও স্বীকৃতি ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পর্যবেক্ষণের মতো কাজের জন্য এই বৈষম্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কারণ এ ধরনের গবেষণা এক বছরের প্রকল্প দিয়ে হয় না; একই ধরনের তথ্য বহু বছর ধরে সংগ্রহ করতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেতন ও পেশাগত স্থায়িত্বের সংকট। গবেষণা পেশায় থাকা অনেক তরুণ বিজ্ঞানী পরিবারসহ দীর্ঘমেয়াদি জীবন গড়ার মতো আয় পাননি। সরকারি কর্মীদের বেতন সমন্বয়ও বিভিন্ন সময়ে ধাপে ধাপে হয়েছে—শিক্ষা খাতে ২০২২ সালের মে থেকে, স্বাস্থ্য খাতে ২০২৩ সালের মে থেকে এবং অন্যান্য সরকারি কর্মী ও কাউন্সিল কর্মীদের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে। ফলে গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা বেতন কাঠামোর মধ্যে ছিলেন।
এটি কেবল চাকরির সন্তুষ্টির প্রশ্ন নয়। দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ প্রয়োজন। একজন গবেষক যদি কয়েক বছর পরই পেশা ছেড়ে দেন, তাহলে একটি দশকব্যাপী পর্যবেক্ষণ সিরিজের ধারাবাহিকতা ভেঙে যেতে পারে।
গবেষণা অনুমতিকে শুধু অনুমতি হিসেবে দেখলে চলবে না
বিদেশি গবেষকদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় মালদ্বীপের গবেষণা অনুমতি ব্যবস্থার প্রশ্নটি কেন্দ্রে আসা উচিত।
সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনের অধীনে উপকূলীয় রাষ্ট্রের গবেষণা অনুমোদনের সঙ্গে গবেষণায় অংশগ্রহণ, প্রাথমিক প্রতিবেদন ও চূড়ান্ত ফল পাওয়ার মতো অধিকারও রয়েছে। অর্থাৎ ছোট একটি রাষ্ট্র চাইলে গবেষণা অনুমতিকে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু মালদ্বীপের বর্তমান প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে মূলত প্রশাসনিক অনুমতির মতো কাজ করেছে। কোনো প্রকল্পে মালদ্বীপীয় সহগবেষককে বাধ্যতামূলক করা হয়নি, জাতীয় ডেটাবেসে তথ্য জমা দেওয়ার সাধারণ শর্ত নেই, গবেষণার ফল বা প্রকাশনা রাষ্ট্রকে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই এবং পূর্ববর্তী গবেষণা থেকে স্থানীয় সহলেখক তৈরির রেকর্ডও নবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর বিবেচ্য নয়।
এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত ভুলটি হয়েছে।
বিদেশি গবেষকরা কোনো ফাঁক গলে মালদ্বীপে গবেষণা করছেন—এমনটা ভাবলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে। তারা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করছেন, যা গবেষণার অনুমতিকে সক্ষমতা তৈরির চুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেনি।
অথচ মালদ্বীপের নিজের অভিজ্ঞতাই দেখিয়েছে, শর্ত কার্যকর করা সম্ভব। টুনা গবেষণায় আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং সনদপ্রক্রিয়া স্থানীয় সক্ষমতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সালের নেকটন অভিযানে আগেই তথ্য ও নমুনার মালিকানা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মশালা এবং নতুন প্রজাতির নামকরণে মালদ্বীপীয় বিজ্ঞানীদের অধিকার নির্ধারিত ছিল। লিখিত শর্ত থাকলে স্থানীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করা যায়—এই উদাহরণগুলো সেটিই প্রমাণ করে।
একটি রাজধানীকেন্দ্রিক গবেষণা ব্যবস্থা দিয়ে ৯০০ কিলোমিটার সমুদ্রকে বোঝা সম্ভব নয়
মালদ্বীপের ভৌগোলিক বাস্তবতাও গবেষণা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি বড় কারণ। দেশটি উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। মালদ্বীপীয় নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় ২ হাজার ৪১টি পৃথক প্রবালপ্রাচীরের তালিকা পাওয়া গেছে, যেগুলোর মোট আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৪৯৪ বর্গকিলোমিটার।
এত বড় একটি সামুদ্রিক ভূখণ্ডকে মালেতে কেন্দ্রীভূত একটি দলের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা স্বাভাবিকভাবেই ব্যয়বহুল।
দূরবর্তী কোনো প্রবালপ্রাচীরে যেতে হলে নৌযান বা উড়োজাহাজ, সরঞ্জাম পরিবহন, ডাইভিং উপকরণ, থাকার ব্যবস্থা, দৈনিক ভাতা এবং দীর্ঘ সময়ের কর্মঘণ্টা প্রয়োজন হয়। ফলে নির্দিষ্ট বাজেটে কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে বেশি নমুনা নেওয়ার জন্য বেছে নেওয়া প্রশাসনিকভাবে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে তা পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না।
হুভাধু অ্যাটল এর সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অ্যাটল এবং বিশ্বের বৃহত্তম অ্যাটলগুলোর একটি। মালেতে প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব অনেক, অথচ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের বিচারে এটিকে কম গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। দূরত্ব ও ব্যয়ের কারণে নিয়মিত কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বাইরে পড়ে গেলে সেটি বৈজ্ঞানিক অগ্রাধিকারের ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাধান তাই আরও একটি কেন্দ্রীয় প্রকল্প নয়
মালদ্বীপের প্রয়োজন গবেষণাকে আরও বেশি রাজধানীকেন্দ্রিক করা নয়; বরং আঞ্চলিক সক্ষমতা তৈরি করা।
উত্তর ও দক্ষিণে দুটি স্থায়ী আঞ্চলিক সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। ছোট নৌযান, ডাইভিং সরঞ্জাম, ভেজা গবেষণাগার এবং সীমিতসংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মী থাকলেই দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের খরচ নাটকীয়ভাবে কমানো সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন খাত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য অংশীদারের তথ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। কোনো একক প্রতিষ্ঠান পুরো প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে না; বরং নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও লিখিত সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করা হয়।
মালদ্বীপেও এমন ভিত্তি ইতোমধ্যে রয়েছে। জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট ও প্রোটোকল আছে, পরিবেশ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক তৈরির ব্যবস্থা আছে। শতাধিক রিসোর্টে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নিয়মিত প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণ করেন। ডাইভ অপারেটর ও রিফ চেক নেটওয়ার্কের কাছেও বহু বছরের তথ্য রয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও নৌযান।
অর্থাৎ সমস্যা সম্পদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। সমস্যা হলো এই সম্পদগুলোকে একটি জাতীয় বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়নি।
জলবায়ু পরিবর্তন অপেক্ষা করবে না
এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা শুধু একাডেমিক মর্যাদার প্রশ্ন নয়। মালদ্বীপের প্রবালপ্রাচীর দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের সামুদ্রিক তাপপ্রবাহে পানির তাপমাত্রা প্রায় ৩১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। কেন্দ্রীয় অ্যাটলগুলোর জরিপ করা এলাকায় গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি জীবন্ত প্রবাল আচ্ছাদন হারানোর তথ্য পাওয়া যায়; আরি অ্যাটলের একটি লেগুন প্রবালপ্রাচীরে ক্ষতি ছিল ৫৭ শতাংশ। এর পর ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রবাল ব্লিচিংয়ের উচ্চঝুঁকির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং সেই ঝুঁকি ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে গবেষণার সময়সীমা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো বড় ব্লিচিংয়ের পরে তথ্য সংগ্রহ করে লাভ আছে, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান বৈজ্ঞানিক রেকর্ড তৈরি হয় যখন ঘটনার আগে, চলাকালীন এবং পরে একই জায়গা একই পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
মালদ্বীপ যদি আবারও প্রস্তুতিহীন অবস্থায় থাকে, তাহলে নিজের প্রবালপ্রাচীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণাটি হয়তো আবারও বিদেশি দলের হাতেই তৈরি হবে।

কী করা দরকার
প্রথমত, গবেষণা অনুমতিকে সুবিধা ও সুফল ভাগাভাগির ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। প্রতিটি বড় প্রকল্পে একজন নির্দিষ্ট মালদ্বীপীয় সহগবেষক, জাতীয় প্রতিষ্ঠানে তথ্য ও নমুনা জমা, গবেষণার ফল ও স্থানীয় ভাষায় সারসংক্ষেপ প্রদান এবং প্রকল্পের আকার অনুযায়ী সক্ষমতা উন্নয়নের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। অনুমতির একটি উন্মুক্ত রেজিস্টারও প্রয়োজন, যাতে আগের প্রকল্পের ফলাফল ও শর্তপূরণের ইতিহাস দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের জন্য আলাদা ও সুরক্ষিত অর্থায়ন প্রয়োজন। কোনো প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন একটি পর্যবেক্ষণ সিরিজও শেষ হয়ে না যায়। প্রতিটি কর্মসূচিতে অন্তত দুইজন প্রশিক্ষিত কর্মী রাখা জরুরি, যাতে একজন চলে গেলে পুরো ধারাবাহিকতা ভেঙে না পড়ে।
তৃতীয়ত, উত্তর ও দক্ষিণে দুটি আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। রিসোর্ট, এনজিও, ডাইভ অপারেটর, স্থানীয় কাউন্সিল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন জাতীয় ডেটাবেসের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। তথ্যের মালিকানা, ব্যবহার এবং প্রকাশনায় লেখকত্বের নিয়ম আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে হবে।
চতুর্থত, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে শুধু গবেষণা পরিচালনাকারী সংস্থা হিসেবে নয়, প্রকাশনা তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি বড় জরিপের জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত লেখক, নির্দিষ্ট জমাদানের সময়সীমা এবং অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার নির্ধারিত ব্যবস্থা থাকা উচিত। জাতীয় গবেষণা বুলেটিনের মতো প্রকাশনা ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা গেলে বহু তথাকথিত ‘গ্রে লিটারেচার’ও সহজে খুঁজে পাওয়া ও উদ্ধৃত করা সম্ভব হবে।
পঞ্চমত, গবেষকদের বেতন ও ক্যারিয়ার কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে। গবেষণা পেশা যেন এমন না হয় যে দক্ষ বিজ্ঞানী কয়েক বছর পর বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যান। একই সঙ্গে গবেষণাপত্র প্রকাশের খরচের জন্য কেন্দ্রীয় সহায়তা এবং গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বণ্টনের স্বচ্ছ নিয়মও দরকার।
সবশেষে, যা অর্জন করতে চাই তা পরিমাপ করতে হবে। স্থানীয় প্রথম-লেখক, গবেষণা অনুমতির শর্তপূরণ এবং জাতীয় ডেটাবেসে তথ্য জমার হার—এসবকে পরিবেশ ও মৎস্য খাতের কৌশলগত সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কারণ কোনো বিষয় পরিমাপের মধ্যে না থাকলে সেটিকে নিয়মিতভাবে পরিচালনা করাও কঠিন।
দোষারোপ নয়, কাঠামো বদলানোর সময়
মালদ্বীপের সামুদ্রিক গবেষণায় বিদেশি আধিপত্যের সমস্যা বাস্তব। কিন্তু শুধু বিদেশি গবেষকদের দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ অদৃশ্য থেকে যাবে। আবার সব দায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপিয়ে বিদেশি গবেষণার অসম কাঠামো অস্বীকার করাও সমান ভুল।
বাস্তবতা হলো, বিদেশি গবেষকরা একটি সুযোগ ব্যবহার করেছেন; সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি হয়েছে মালদ্বীপের নিজস্ব গবেষণা ব্যবস্থার দুর্বলতার মধ্য দিয়ে।
যে ব্যবস্থা রপ্তানি বাজার বা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনকে গবেষণার জন্য শক্তিশালী প্রণোদনায় পরিণত করতে পেরেছে, কিন্তু প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণের মতো জাতীয় পরিবেশগত প্রয়োজনকে একই গুরুত্ব দেয়নি; যে ব্যবস্থা ২ হাজারের বেশি প্রবালপ্রাচীর ও প্রায় ৯০০ কিলোমিটার বিস্তৃত সমুদ্রের দায়িত্ব একটি রাজধানীকেন্দ্রিক সক্ষমতার ওপর রেখেছে; যে ব্যবস্থা একজন গবেষককে দশ বছর ধরে ধরে রাখার মতো পেশাগত নিরাপত্তা দিতে পারেনি; যে ব্যবস্থা গবেষণার খসড়া সংশোধন করে প্রকাশনায় নেওয়ার বদলে অনেক সময় তা ফেলে রেখেছে; এবং যে ব্যবস্থা গবেষণা অনুমতিকে জ্ঞান ও সক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি না বানিয়ে প্রশাসনিক অনুমতিতে সীমাবদ্ধ রেখেছে—সমস্যার বড় অংশ সেখানেই।
তাই সমাধানও স্পষ্ট। গবেষণা অনুমতির শর্ত বদলাতে হবে, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের জন্য অর্থ নিশ্চিত করতে হবে, বিজ্ঞানীদের ন্যায্য বেতন ও পেশাগত স্থায়িত্ব দিতে হবে, প্রকাশনাকে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্বের অংশ করতে হবে এবং দেশের উত্তর ও দক্ষিণে বাস্তব গবেষণা সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তাহলে স্থানীয় বিজ্ঞানীদের প্রথম-লেখক হওয়ার হার বাড়াতে কাউকে লজ্জা দিতে হবে না। ব্যবস্থা বদলালেই ফল বদলাবে।
মালদ্বীপের সামনে এখন মূল প্রশ্নটি কে গবেষণা করছে তা নয়। প্রশ্ন হলো, আগামী বড় প্রবাল ব্লিচিংয়ের সময় দেশটি কি নিজের সমুদ্রের পরিবর্তন নিজেই নথিবদ্ধ করতে পারবে?
যদি না পারে, তাহলে কয়েক বছর পর আবারও একই ডেটাবেসে একই প্রশ্ন উঠবে। আর উত্তরটিও হয়তো একই থাকবে—নিজেদের সমুদ্র নিয়ে জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাতাগুলো অন্য কেউ লিখেছে।
লেখকঃ নিজাম ইব্রাহিম, মালদ্বীপ মেরিন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা (২০১৫–২০২১); সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর এবং প্রবালপ্রাচীর পুনরুদ্ধার বিষয়ে পিএইচডি গবেষক।
নিজাম ইব্রাহিম 


















