তীব্র গরমের মধ্যে দেশে বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জনজীবনের পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। দিনের বেলায় অসহনীয় গরম আর রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকাতেও এখন রাতের বেলায় লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াট
সাম্প্রতিক উৎপাদন ও চাহিদার হিসাবেই সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট। ১১ আগস্ট মধ্যরাতে দেশে লোডশেডিং সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট। ১২ আগস্ট বিকেল ৩টায়ও বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট।
৯ আগস্ট ঘাটতি একপর্যায়ে ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং পরদিন ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে ওঠে। সাম্প্রতিক এই ঘাটতি ২০২৩ সালের ২৭ জুনের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট লোডশেডিংকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ময়মনসিংহের কিছু এলাকায় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেট ও বরিশালের কিছু এলাকাতেও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। ঢাকার বসুন্ধরা, ইস্কাটন, কাজীপাড়া, মৌচাক, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, পশ্চিম রাজাবাজার ও মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকায় রাতের দিকে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর এসেছে।
পড়ার সময় বিদ্যুৎ নেই, রাতে গরমে ঘুম নেই
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। দিনের গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘরের ভেতর গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ফলে পড়ার সময় কমে যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
অনলাইন ক্লাস, ভিডিও লেকচার, ডিজিটাল বই, মডেল টেস্ট ও ভর্তি প্রস্তুতির মতো বিদ্যুৎনির্ভর শিক্ষাকার্যক্রমও থেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সমস্যাও এই ভোগান্তি আরও বাড়াচ্ছে।
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপরও পড়েছে এর প্রভাব। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা ২ জুলাই শুরু হয়ে ৮ আগস্ট শেষ হয়েছে। পরীক্ষার সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ শাটডাউন স্থগিত রাখা হয়েছিল।

সক্ষমতা আছে, জ্বালানি নেই
বর্তমান সংকটের বড় কারণ জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ১১ আগস্ট এসব কেন্দ্র পেয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
গ্যাসের অভাবে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক ও পাঁচটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। আরও ৩৪টি কেন্দ্র সক্ষমতার নিচে চলছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার পর গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসা, কৃষি ও শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, রাইস মিল ও অনলাইনভিত্তিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমানো বা সময়সূচি পরিবর্তনের পাশাপাশি অনেককে বাড়তি খরচে ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ক্ষতির ধরন আরও তাৎক্ষণিক। গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, ভর্তি প্রস্তুতি কিংবা অনলাইন ক্লাসের নির্দিষ্ট সময় নষ্ট হলে তা সবসময় পরে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। এইচএসসি লিখিত পরীক্ষা শেষ হলেও ফলাফল, ভর্তি প্রস্তুতি, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং বিভিন্ন শ্রেণির নিয়মিত পড়াশোনায় বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে।
মোহাম্মদপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জিনাত রেদওয়ানা জানান, সন্ধ্যার পর একাধিক দফা লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাজশাহীর দুর্গাপুরের আলীপুর মডেল কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে গ্রামাঞ্চলেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রভাব পড়ছে।
সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম আমিত গ্যাস সরবরাহের সমস্যাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো দেওয়া হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















