ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা তেংগারা (এনটিটি) প্রদেশের ফ্লোরেস দ্বীপের উপকূলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে জোর অভিযান চলছে। শনিবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ৪৭ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা (বিএনপিবি) ও জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা বাসারনাস।
এর আগে শনিবার রাতে নিহতের সংখ্যা ৪০ জন বলে জানানো হয়েছিল। পরে উদ্ধার তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭-এ পৌঁছায়।
ধ্বংসস্তূপে আটকে বহু মানুষ
বাসারনাসের মাউমেরে কার্যালয়ের প্রধান ফাতুর রহমান জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে বেশ কয়েকটি ভবনে মানুষ আটকা পড়েছেন। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে উদ্ধারের ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপিবি প্রধান সুহারিয়ান্তো জানান, যেসব ভবনে মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলোতেই দুর্যোগ মোকাবিলা দলের প্রাথমিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে উদ্ধারকারীদের কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমিধস। এতে বিভিন্ন সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রায় ১৬০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত
ভূমিকম্পে প্রায় ১৬০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক ডজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং অন্যান্য সরকারি ও জনসেবামূলক স্থাপনাও ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপিবি।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন জানিয়েছে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা প্রায় ২ হাজার মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ইন্দোনেশিয়া সরকারও দুর্গত এলাকায় ৫০ হাজার ত্রাণ প্যাকেট পাঠিয়েছে, যার মোট ওজন প্রায় ২৭৫ টন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তার প্রস্তাব
উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ইউরোপের কোপার্নিকাস আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট ব্যবহার করে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করা হবে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তি শনিবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫৮ মিনিটে। এর উপকেন্দ্র ছিল ফ্লোরেসের উত্তর উপকূলের সাগরে, এনদে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। মূল কম্পনের পর একই এলাকায় একাধিক শক্তিশালী পরাঘাত অনুভূত হয়, যার মধ্যে একটি ছিল ৬ দশমিক ১ মাত্রার।
প্রথমে সুনামি সতর্কতা, পরে প্রত্যাহার
ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা বিএমকেজি প্রাথমিকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। তবে শনিবার সকালেই সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে, কারণ পরাঘাতে দুর্বল ভবন ধসে পড়তে পারে।
ভূমিকম্পের পর ফ্লোরেসের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কম্পনটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। রুটেং শহরের বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইউলিয়ান জুইতা একালিয়া বলেন, ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল তারা যেন ট্রাম্পোলিনের ওপর অবস্থান করছেন।
ফ্লোরেসে এর আগেও ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৯৯২ সালে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর সুনামি আঘাত হানে এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়।
এদিকে শনিবার উত্তর সুমাত্রাতেও ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। বিএমকেজি জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১৬৮ কিলোমিটার এবং এর উপকেন্দ্র ছিল সিমালুঙ্গুন রিজেন্সির প্রায় ১১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। প্রদেশটির তেবিং তিঙ্গি, কান্দাহে ও লিমাপুলুহ শহরের বাসিন্দারাও কম্পন অনুভব করেন।
ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৪৭-এ পৌঁছেছে; ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে চলছে জোর অভিযান। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে হাজার হাজার ত্রাণ প্যাকেট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















