দেশের অব্যবহৃত নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও হাওর সংস্কার করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেকার তরুণদের মধ্যে ব্যবহারের সুযোগ বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের মিনি স্টেডিয়ামে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জলাশয় ব্যবহারে বেকারদের সুযোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহু নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও হাওর বর্তমানে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। সরকার এসব জলাশয় সংস্কার করে সেখানে মাছের পোনা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বেকার তরুণদের এসব জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে তারা মৎস্য চাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতার সুযোগ পান।
মৎস্য খাতে রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা
মৎস্য খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
তিনি মৎস্য খাতে নতুন বাজার খুঁজে বের করতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান। বিদেশে নতুন নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করতে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী জানান, খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে ৭ হাজার ৫০০টি ঘেরে ইতোমধ্যে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি’ বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ এবং জাতীয় জিডিপিতে এর অবদান ১ শতাংশের বেশি। ‘ইলিশ ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর ধারাবাহিকতায় দেশে ইলিশ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতার আহ্বান
মৎস্যসম্পদ রক্ষায় হাওর ও জলাশয়ের পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, মাছের উৎপাদন টেকসই রাখতে হলে পানি ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা, টিস্যু পেপার ও প্লাস্টিকের পানির বোতল ফেলার কারণে খাল-বিল, নদী-নালা ও হাওরের পরিবেশ ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবার, পানি, মাছ ও পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জেলেদের জন্য সহায়তা, তরুণদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য চাষিদের কৃষক কার্ড, জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলের নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের ভিজিএফ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করেছে। সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তারা এই তহবিল থেকে শিল্প শুরু বা উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান পেতে পারেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের অনুষ্ঠানে ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণ পদক) দেওয়া হয়। এবারের মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচিব ও মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শোলাকিয়া মাঠে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
অব্যবহৃত জলাশয়, বেকার তরুণ, মৎস্য খাত
মৎস্য খাতকে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে এগিয়ে নিতে অব্যবহৃত জলাশয়কে উৎপাদনমুখী ব্যবহারে আনার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজা, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, জেলেদের সহায়তা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















