ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর আগে থেকেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে সতর্ক সংকেত ছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই এখন কৌশলগত চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি ওয়াশিংটনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস উপকূলীয় এলাকায় সামরিক মহড়া চালায়। ‘হরমুজ প্রণালির স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ’ নামের সেই মহড়া ছিল স্পষ্ট বার্তা—প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে নিজেদের কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করবে তেহরান। যুদ্ধ শুরুর পর বাস্তবেও তাই ঘটেছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। ইরানের পদক্ষেপের পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও চাপ তৈরি হয়।
যুদ্ধ-পরিকল্পনায় যে বিষয়টি আগেই অনুমান করা হয়েছিল
মার্কিন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, বহু বছর ধরে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধ-পরিকল্পনা ও অনুশীলনে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে তেহরানের প্রথম প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি হবে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করা। তাদের ভাষায়, এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিচিত ঝুঁকি।
তবুও ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত কয়েকটি ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করেছিল। একটি ছিল, ইরানের সরকার দ্রুত দুর্বল বা পতনের মুখে পড়বে। আরেকটি ছিল, প্রণালি বন্ধ করলে ইরান নিজেও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে এমন পদক্ষেপ নেবে না।
ইরানের নতুন কৌশল
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, ইরান বিপুল সংখ্যক নৌ-মাইন ব্যবহার করে প্রণালিকে অচল করবে। কিন্তু বাস্তবে তারা ভিন্ন পথ বেছে নেয়। ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্পমূল্যের ড্রোন ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ভীতি সৃষ্টি করা হয়। এতে নিজেদের তেল পরিবহন অনেকাংশে সচল রেখেও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় তেহরান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় ড্রোনের এই ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রত্যাশার তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে মার্কিন বাহিনীকে।
মিত্রদের সহায়তার হিসাবও মিলল না
ওয়াশিংটনের আরেকটি প্রত্যাশা ছিল, ইরান যদি প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করে তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা দ্রুত যৌথ উদ্যোগে পরিস্থিতি সামাল দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন একটি জোট সহযোগিতার আগ্রহ দেখালেও তারা আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতার অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সীমিত পরিসরে কিছু জাহাজকে নিরাপদে পারাপারে সহায়তা করলেও তা বৈশ্বিক বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একতরফাভাবে পুরো প্রণালি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে বড় ধরনের সামরিক ঝুঁকি নিতে হবে।
কেন পরিস্থিতি এত জটিল
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নৌকা, মিসাইল, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করতে হলে ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান প্রয়োজন হবে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান অচলাবস্থা কেবল সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















