মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: একটি ছোট কিন্তু ধনী রাষ্ট্র কি আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর না করে একাই নিজস্ব নিরাপত্তা ও প্রভাব নিশ্চিত করতে পারে? সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি যেন সেই প্রশ্নেরই বাস্তব পরীক্ষা।
গত এক দশকে আমিরাত নিজেকে শুধু একটি তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। আবুধাবি ও দুবাইকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এমন এক রাষ্ট্রপরিকল্পনা, যেখানে অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে একত্রে ব্যবহার করে বৃহত্তর প্রভাব অর্জনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাত সেই পরিকল্পনার অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্ট করে তুলছে।
আমিরাতের কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল একটি ধারণা—আঞ্চলিক সংঘাত থাকবে, কিন্তু সেগুলো দেশের ভেতরে প্রবেশ করবে না। রাষ্ট্রটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগী, আবার বহু আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই বহুমাত্রিক অবস্থান তাকে দীর্ঘদিন সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু যখন যুদ্ধ সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় আমিরাত, তখন সেই ভারসাম্যের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়।
যুদ্ধের পর আমিরাত যে পথে হাঁটছে, তা আসলে নীতিগত পরিবর্তনের চেয়ে আগের কৌশলকে আরও জোরালোভাবে অনুসরণ করার ইঙ্গিত দেয়। দেশটি এখন ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রাখতে আগ্রহী হচ্ছে এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান হতাশা প্রকাশ করছে।
এখানেই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আমিরাত নিজেকে আরও স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে অংশীদারদের ওপর নির্ভর করছে, তারা সবাই তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে কৌশলগত স্বাধীনতার অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত নতুন ধরনের নির্ভরতায় রূপ নিতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য এখন আরও স্পষ্ট। রিয়াদ যেখানে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমঝোতার পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে আবুধাবি নিরাপত্তা ও প্রতিরোধমূলক শক্তির ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। এই বিভাজন শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলছে না; এটি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের যৌথ অবস্থানকে দুর্বল করছে। আরব রাষ্ট্রগুলো যখন একক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তখন বাইরের শক্তিগুলোই আঞ্চলিক রাজনীতির নিয়ামক হয়ে ওঠে।
আমিরাতের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। দেশটি নিজেকে আন্তর্জাতিক পুঁজি, প্রযুক্তি ও প্রতিভার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মধ্যে এমন পরিবেশ ধরে রাখা কঠিন। বিনিয়োগকারীরা শুধু কর সুবিধা বা অবকাঠামো দেখে সিদ্ধান্ত নেন না; তারা স্থিতিশীলতাও বিবেচনা করেন। যদি উপসাগরীয় অঞ্চলকে ক্রমাগত সংঘাতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে দেখা হয়, তবে আমিরাতের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দেশটি আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা আরও বাড়াতে পারে। বন্দর, খনিজ সম্পদ, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক করিডর ঘিরে তার আগ্রহ নতুন নয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বিনিয়োগ যখন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা প্রায়ই স্থানীয় প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আমিরাত-সম্পর্কিত উদ্যোগ নিয়ে যে বিতর্ক দেখা গেছে, তা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করে।
অবশ্য ভবিষ্যৎ এখনো নির্ধারিত নয়। যদি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পায়, তাহলে আমিরাত আরও দৃঢ়ভাবে সামরিক জোটনির্ভর পথে এগোতে পারে। আবার যদি নতুন কূটনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমে, তাহলে একই আমিরাত প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগও নিতে পারে। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি অতীতে বহুবার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিবর্তিত হয়েছে।
তবু একটি বিষয় পরিষ্কার। আঞ্চলিক প্রভাব অর্জনের জন্য শক্তিশালী বন্ধু থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্থায়ী প্রভাব গড়ে ওঠে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্কের ভিত্তিতে। আমিরাত যদি নিরাপত্তার খোঁজে ক্রমশ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং একই সঙ্গে উপসাগরীয় অংশীদারদের থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তার কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হতে পারে।
আবুধাবির সামনে তাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যুদ্ধ নয়, বরং ভারসাম্য। কারণ একটি রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, নিজের অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা যদি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে, তবে সেই স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত নতুন নির্ভরতার আরেক নাম হয়ে উঠতে পারে।
অ্যান্ড্রু লেবার 



















