বিশ্বজুড়ে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন অগ্রগতি রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য নিয়ে এসেছে বড় ধরনের আশার বার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ক্যানসারবিষয়ক সম্মেলনে একাধিক গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধ, নির্ণয় ও চিকিৎসার ধরন বদলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছর ক্যানসার চিকিৎসায় এমন কয়েকটি সাফল্য এসেছে, যা রোগীর আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কমাতে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে নতুন যুগের সূচনা
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত চিকিৎসা নেওয়ার পরও রোগীদের গড় আয়ু মাত্র কয়েক মাস থাকে।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ড্যারাক্সনরাসিব নামের একটি ওষুধ টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে রোগীদের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে গড় বেঁচে থাকার সময় ৬.৭ মাস থেকে বেড়ে ১৩.২ মাসে পৌঁছেছে।
এই ফলাফল সম্মেলনে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার গবেষণাগুলোর একটি বলে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ, ওষুধটি যে প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে, তা অনেক আক্রমণাত্মক ক্যানসারের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। ফলে ভবিষ্যতে আরও বিপুলসংখ্যক রোগী এর সুবিধা পেতে পারেন।

কম কষ্টের, আরও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা
ক্যানসার চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু রোগ সারানো নয়, রোগীর জীবনমানও উন্নত করা। এ বছর প্রকাশিত গবেষণাগুলো সেই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
স্তন ক্যানসারের একটি হরমোননির্ভর ধরনে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অপটিমা নামের জিনগত পরীক্ষায় কম ঝুঁকির ফল পাওয়া গেলে কেমোথেরাপি ছাড়াও সমান কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এর ফলে বহু রোগী কেমোথেরাপির কঠিন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই পেতে পারেন।
অন্যদিকে, অগ্রসর পর্যায়ের মূত্রথলির ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্যও এসেছে আশাব্যঞ্জক খবর। গবেষণায় দেখা গেছে, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সঙ্গে ইমিউনোথেরাপি যুক্ত করলে অনেক ক্ষেত্রে মূত্রথলি অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচার এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এতে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও স্বাধীনতা অনেকটাই বজায় রাখতে পারবেন।
‘অলৌকিক’ বড়ি নিয়ে নতুন আশা
সম্মেলনের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯ নামের একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ, যাকে অনেক গবেষক ‘অলৌকিক’ বড়ি হিসেবে উল্লেখ করছেন।
ইমিউনোথেরাপি বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলেও সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি সমান কার্যকর হয় না। অনেক টিউমার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

নতুন এই ওষুধ টিউমারকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে দৃশ্যমান করে তুলতে সাহায্য করে। প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় এটি টিউমারের আকার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে। যদিও গবেষণা এখনও প্রাথমিক ধাপে রয়েছে, তবু ফলাফলকে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওজন কমানোর ওষুধে ক্যানসার ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত
ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ নিয়েও সম্মেলনে বেশ কয়েকটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়েছে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিরা এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করলে তাদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমতে পারে। আরও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
এ ছাড়া ফুসফুস, স্তন, অন্ত্র ও যকৃতের ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ রোগের অগ্রগতি ধীর করতে সাহায্য করেছে এবং চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছানোর ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে।
গবেষক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ওষুধ, জিনগত পরীক্ষা এবং উদ্ভাবনী চিকিৎসাপদ্ধতির এই অগ্রগতি আগামী বছরগুলোতে ক্যানসার চিকিৎসার চিত্র আমূল বদলে দিতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, এমন সাফল্য ধরে রাখতে গবেষণা খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অপরিহার্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















