একসময় ভারতের মানুষের কাছে বার্তা ছিল বেশি সন্তান না নেওয়ার। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারি নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ উল্টো কারণে—ভারতে জন্মহার দ্রুত কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ১ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত ২ দশমিক ১ হার প্রয়োজন বলে ধরা হয়। অর্থাৎ ভারত এখন সেই সীমার নিচে অবস্থান করছে।
দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে বড় পরিবর্তন
ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে জন্মহার উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের সমপর্যায়ে নেমে এসেছে। তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে এই হার প্রায় ১ দশমিক ৩। মহারাষ্ট্রেও হার খুবই কম।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। তামিলনাড়ুতে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে গত বছর শত শত বিদ্যালয় বন্ধ করতে হয়েছে। পরিবারগুলোতে একমাত্র সন্তান এখন ক্রমেই সাধারণ চিত্র হয়ে উঠছে।
জনসংখ্যা বাড়লেও জন্ম কমছে
ভারতের মোট জনসংখ্যা এখনও বাড়ছে। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৪৫ কোটির বেশি। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে গেছে। ২০০১ সালের তুলনায় বর্তমানে বার্ষিক জন্মসংখ্যা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম জন্মহারের প্রভাব পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে সময় লাগে। তাই জনসংখ্যা এখনই কমছে না, কিন্তু ভবিষ্যতে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে।
কেন কমছে জন্মহার
জন্মহার কমার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোকে আগের মতো বেশি সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করতে হচ্ছে না।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মেয়েদের শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে। শিক্ষিত নারীরা নিজের জীবন ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে বেশি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। একই সঙ্গে সন্তানদের ভালো শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবারগুলো কম সন্তান নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে।
ভারতে বেসরকারি শিক্ষার বিস্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সন্তানের পেছনে ব্যয় বাড়ায় অনেক পরিবার সীমিত সংখ্যক সন্তান রাখাকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছে।
প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব
টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন মানুষের জীবনধারা ও প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে। শহুরে ছোট পরিবারের জীবনযাপন এখন দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও পরিচিত হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং সামাজিক আকাঙ্ক্ষার বিস্তার পরিবার পরিকল্পনার ধরণকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।
অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
কম জন্মহার শুধু জনসংখ্যার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে উৎপাদনশীলতা ও শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রবীণদের যত্নে সরকারি ব্যয় বাড়বে। ফলে সরকারকে কর আদায় বাড়ানো এবং আরও বেশি মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী একই প্রবণতা
ভারত একা নয়। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশ এখন জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন হারের নিচে অবস্থান করছে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোর পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশেও জন্মহার দ্রুত কমছে।
এ কারণে ভবিষ্যতে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি আগের ধারণার তুলনায় অনেক কম হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ভারতের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা জন্মহার কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও দ্রুত বদলে যায়, যার জন্য দেশগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















