১২:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা, বলল নয়াদিল্লি বগুড়ার বাংলি নদী থেকে স্কুলছাত্রের মরদেহ উদ্ধার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এনসিপির বৈঠক, রোহিঙ্গা সংকট ও সহযোগিতা জোরদারে আলোচনা নড়াইলে যাত্রীবাহী বাস উল্টে আহত ২০, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যুদ্ধের আগুনে গড়া নতুন ইরান: বিপ্লবের রাষ্ট্র থেকে জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্রে রূপান্তর বার্ধক্য উল্টে দেওয়ার দাবিতে বিপুল বিনিয়োগ, ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার পেল জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইরানের সম্পদ ব্যবহারের চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের, যুদ্ধবিরতি ঘিরে নতুন উত্তেজনা লেবানন থেকে ফিরছে দুই বাংলাদেশির মরদেহ, ঢাকায় পৌঁছাবে ভোরে ওহাইও উৎসবের কাছে গোলাগুলি, আহত ১২; আতঙ্কে কেঁপে উঠল এলাকা খুলনায় মাদকের অন্ধকার সাম্রাজ্য, আড়ালে থেকে যাচ্ছে মূল নিয়ন্ত্রকেরা

পরিবারের ভেতরের হত্যাকাণ্ড কমছে না, যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে গৃহস্থালি সহিংসতা

যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের হার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। জুনের প্রথম দুই দিনেই তিনটি পৃথক ঘটনায় তিন বাবা তাদের সন্তান ও সন্তানদের মাকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব ঘটনায় মোট ১৩ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটির বয়স ছিল মাত্র তিন বছর।

আইওয়া, নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাকে স্থানীয় কর্মকর্তারা ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করলেও মনোবিজ্ঞানী ডোরিন ডজেন-ম্যাগির মতে, এগুলোর অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।

গৃহস্থালি সহিংসতার দীর্ঘস্থায়ী সংকট

গত তিন দশক ধরে গৃহস্থালি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করে আসছেন ডজেন-ম্যাগি। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই বিষয়টির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বহু বছর আগে তাঁর ভগ্নিপতি নিজের স্ত্রী ও তিন কন্যাকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। সেই ঘটনার স্মৃতি থেকেই তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো গৃহস্থালি সহিংসতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে পারেনি।

মহামারির সময় হত্যাকাণ্ড বেড়ে গেলেও পরে সামগ্রিকভাবে তা কমতে শুরু করে। কিন্তু পারিবারিক ও সঙ্গীকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সেই পতন দেখা যায়নি। গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, চার বা তার বেশি পরিবারের সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ২০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর আবার বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই এমন ঘটনার সংখ্যা পুরো ২০২৫ সালের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে

ফেডারেল তথ্য অনুযায়ী, একাধিক পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গী নিহত হওয়ার ঘটনা ২০২২ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর কিছুটা কমলেও তা এখনো ২০২০ সালের আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ ধরনের সহিংস ঘটনায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট হত্যাকাণ্ডের ২১ শতাংশই পরিবার বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কভিত্তিক হত্যাকাণ্ড, যেখানে ২০২০ সালে এই হার ছিল ১৫ শতাংশ।

Dual Tragedies: Domestic Homicide-Suicides with a Firearm | Everytown  Research & Policy

সতর্ক সংকেত উপেক্ষার মূল্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার আগে সতর্ক সংকেত দেখা যায়। ডজেন-ম্যাগি বলেন, তাঁর ভগ্নিপতি শুরু থেকেই অত্যন্ত ঈর্ষাপরায়ণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ করতেন। কিন্তু আশপাশের মানুষ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তাঁর বোন নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ নিয়ে সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিলেও হামলাকারী অস্ত্র সংগ্রহ করে সেখানে পৌঁছে যায়। সেই হামলায় পরিবারের প্রায় সবাই নিহত হন।

অস্ত্র ও মানসিকতার ভূমিকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ পারিবারিক গণহত্যার ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। তবে শুধু অস্ত্রের সহজলভ্যতাই নয়, এর পেছনে থাকে অধিকারবোধ, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ক্ষোভ কিংবা বিকৃত সম্মানবোধ।

নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্স বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গী সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে হামলাকারী সন্তানদের ক্ষতির মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে চায়। আবার কখনো চাকরি হারানো বা সামাজিক মর্যাদা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।

কঠোর আইন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দাবি

গবেষক ও অধিকারকর্মীরা অস্ত্রের নিরাপদ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার আইনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, তাৎক্ষণিক ক্রোধের মুহূর্তে অস্ত্র হাতে পাওয়া না গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

অন্যদিকে, সহিংসতার শিকার পরিবারের সদস্যদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক সংকট, আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাই প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নেয়।

তবে যাঁরা এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন বা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাঁদের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট—পরিবারের ভেতরের সহিংসতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার বড় সংকট হিসেবে দেখতে হবে। তা না হলে এই রক্তাক্ত চক্র থামানো কঠিন হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা, বলল নয়াদিল্লি

পরিবারের ভেতরের হত্যাকাণ্ড কমছে না, যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে গৃহস্থালি সহিংসতা

১১:১০:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের হার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। জুনের প্রথম দুই দিনেই তিনটি পৃথক ঘটনায় তিন বাবা তাদের সন্তান ও সন্তানদের মাকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব ঘটনায় মোট ১৩ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটির বয়স ছিল মাত্র তিন বছর।

আইওয়া, নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাকে স্থানীয় কর্মকর্তারা ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করলেও মনোবিজ্ঞানী ডোরিন ডজেন-ম্যাগির মতে, এগুলোর অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।

গৃহস্থালি সহিংসতার দীর্ঘস্থায়ী সংকট

গত তিন দশক ধরে গৃহস্থালি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করে আসছেন ডজেন-ম্যাগি। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই বিষয়টির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বহু বছর আগে তাঁর ভগ্নিপতি নিজের স্ত্রী ও তিন কন্যাকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। সেই ঘটনার স্মৃতি থেকেই তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো গৃহস্থালি সহিংসতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে পারেনি।

মহামারির সময় হত্যাকাণ্ড বেড়ে গেলেও পরে সামগ্রিকভাবে তা কমতে শুরু করে। কিন্তু পারিবারিক ও সঙ্গীকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সেই পতন দেখা যায়নি। গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, চার বা তার বেশি পরিবারের সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ২০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর আবার বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই এমন ঘটনার সংখ্যা পুরো ২০২৫ সালের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে

ফেডারেল তথ্য অনুযায়ী, একাধিক পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গী নিহত হওয়ার ঘটনা ২০২২ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর কিছুটা কমলেও তা এখনো ২০২০ সালের আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ ধরনের সহিংস ঘটনায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট হত্যাকাণ্ডের ২১ শতাংশই পরিবার বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কভিত্তিক হত্যাকাণ্ড, যেখানে ২০২০ সালে এই হার ছিল ১৫ শতাংশ।

Dual Tragedies: Domestic Homicide-Suicides with a Firearm | Everytown  Research & Policy

সতর্ক সংকেত উপেক্ষার মূল্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার আগে সতর্ক সংকেত দেখা যায়। ডজেন-ম্যাগি বলেন, তাঁর ভগ্নিপতি শুরু থেকেই অত্যন্ত ঈর্ষাপরায়ণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ করতেন। কিন্তু আশপাশের মানুষ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তাঁর বোন নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ নিয়ে সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিলেও হামলাকারী অস্ত্র সংগ্রহ করে সেখানে পৌঁছে যায়। সেই হামলায় পরিবারের প্রায় সবাই নিহত হন।

অস্ত্র ও মানসিকতার ভূমিকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ পারিবারিক গণহত্যার ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। তবে শুধু অস্ত্রের সহজলভ্যতাই নয়, এর পেছনে থাকে অধিকারবোধ, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ক্ষোভ কিংবা বিকৃত সম্মানবোধ।

নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্স বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গী সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে হামলাকারী সন্তানদের ক্ষতির মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে চায়। আবার কখনো চাকরি হারানো বা সামাজিক মর্যাদা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।

কঠোর আইন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দাবি

গবেষক ও অধিকারকর্মীরা অস্ত্রের নিরাপদ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার আইনের পক্ষে মত দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, তাৎক্ষণিক ক্রোধের মুহূর্তে অস্ত্র হাতে পাওয়া না গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

অন্যদিকে, সহিংসতার শিকার পরিবারের সদস্যদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক সংকট, আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাই প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নেয়।

তবে যাঁরা এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন বা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাঁদের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট—পরিবারের ভেতরের সহিংসতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার বড় সংকট হিসেবে দেখতে হবে। তা না হলে এই রক্তাক্ত চক্র থামানো কঠিন হবে।