পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে খরিফ মৌসুমের মধ্যেই সেচের পানির তীব্র সংকট উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সুক্কুর ব্যারাজের রাইট ব্যাংক ক্যানাল সিস্টেমে পানির ঘাটতি লারকানা, কাম্বার-শাহদাদকোট, দাদু ও সুক্কুর জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ক্যানালের মাধ্যমে সেচনির্ভর বেলুচিস্তানের এলাকাগুলোও সংকটের মুখে পড়েছে।
সরকারি সেচ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম ক্যানালে পানির ঘাটতি ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ, রাইস ক্যানালে ৩৮ শতাংশ এবং দাদু ক্যানালে ৮২ শতাংশে পৌঁছেছে। কৃষি মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতি কৃষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পানিবণ্টন নিয়ে নতুন বিতর্ক
সেচ বিভাগের নির্ভরযোগ্য তথ্য বলছে, পাঞ্জাব বর্তমানে তার বরাদ্দ ৪৪ হাজার কিউসেকের বিপরীতে ৫৩ হাজার ৩৯৪ কিউসেক পানি ব্যবহার করছে, যা নির্ধারিত অংশের চেয়ে প্রায় ২১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। একইভাবে তাউনসা ব্যারাজও বরাদ্দের চেয়ে বেশি পানি উত্তোলন করছে।
এদিকে চাশমা ব্যারাজে পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছে। শুক্রবার ৬৪৪ দশমিক ৯ ফুট থেকে তা শনিবার ৬৪৬ দশমিক ৪ ফুটে পৌঁছেছে। ফলে উজানে পানি জমা হলেও ভাটির অঞ্চলে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিন্ধুর দাবি, বরাদ্দের চেয়ে কম পানি
সিন্ধু প্রদেশ ১ লাখ ৩০ হাজার কিউসেক পানির চাহিদাপত্র জমা দিলেও বর্তমানে মাত্র ১ লাখ কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে। ফলে প্রদেশটিকে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে চাশমা-ঝিলম লিংক ক্যানাল, যা এখনও চালু রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি নিচ্ছে। সেচ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিমাণ পানি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চলের কয়েকটি নিম্নপ্রবাহ ক্যানালের সম্মিলিত প্রবাহের চেয়েও বেশি।
_updates.jpg)
কৃষিতে ক্ষতির আশঙ্কা
সিন্ধুর কৃষি অর্থনীতি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। পাকিস্তান পিপলস পার্টির সিন্ধু শাখার সভাপতি নিসার আহমেদ খুহরো বলেছেন, সিন্ধু বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন চাল উৎপাদন করে এবং চাল রপ্তানি থেকে ১৪০ কোটি ডলার আয় করে। তার মতে, খরিফ মৌসুমে প্রদেশটির পানির অংশ কমিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে বড় আঘাতের শামিল।
তিনি দাবি করেন, দেশের মোট কৃষি উৎপাদনের প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে সিন্ধু থেকে, অথচ প্রদেশটি তার ন্যায্য পানির অংশ পাচ্ছে না।
কৃষকদের অপেক্ষা
সিন্ধু আবাদগার বোর্ডের সাবেক নেতা ইশাক মুঘেরি জানান, শাহদাদকোট, কুবো সাঈদ খানসহ বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকরা সাইফুল্লাহ মাগসি শাখা খালের পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রধান সেচ চ্যানেলগুলোর সংস্কার কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় ধান রোপণের প্রস্তুতিও শুরু করা যায়নি।
তার ভাষায়, “আমরা এখনও খালের শেষপ্রান্তে পানি পৌঁছানোর অপেক্ষায় আছি, যাতে ধানের চারা তৈরির কাজ শুরু করা যায়।”
তিনি আরও জানান, দাদু ক্যানালের বরাদ্দ ৪ হাজার ৯৯৫ কিউসেক হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৬০ কিউসেক। উত্তর-পশ্চিম ক্যানালের বরাদ্দ ৬ হাজার ২৬০ কিউসেক হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ১০০ কিউসেক। রাইস ক্যানালের ক্ষেত্রেও বরাদ্দের তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের দাবি
সেচ বিশেষজ্ঞ ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে লাখ লাখ একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তারা ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সিন্ধুর ন্যায্য পানির অংশ নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্যানাল ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে চলতি মৌসুমে কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকদের জীবিকায় গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















