জাপানের দীর্ঘদিনের যৌনবাণিজ্য খাত আবারও জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। রাজধানী টোকিওর রাস্তায় প্রকাশ্যে যৌনসেবা বিক্রির ঘটনা এবং বিদেশি পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা দেশটির আইন, সামাজিক মূল্যবোধ ও নারীর অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
জাপানে যৌনবাণিজ্য কোনো নতুন বিষয় নয়। বহু বছর ধরে এটি দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি অংশ হিসেবে বিদ্যমান। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশটির এই শিল্পের বার্ষিক আর্থিক মূল্য কয়েক ট্রিলিয়ন ইয়েন। অর্থনৈতিক চাপে কিংবা ভালো আয়ের আশায় অনেক নারী এই পেশায় যুক্ত হন। বিশেষ করে মহামারির সময় চাকরির চাপ, আয় কমে যাওয়া এবং পারিবারিক দায়িত্ব অনেক নারীকে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে।

ওকুবো পার্ককে ঘিরে বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে টোকিওর ওকুবো পার্ক এলাকা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। সাধারণত যৌনসেবার লেনদেন নির্দিষ্ট স্থাপনা বা ব্যবসাকেন্দ্রের আড়ালে হলেও, এই এলাকায় কিছু নারীকে প্রকাশ্যে ক্রেতার অপেক্ষায় দেখা যাচ্ছে। জাপানের আইনে প্রকাশ্যে ক্রেতা খোঁজা নিষিদ্ধ হওয়ায় বিষয়টি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে কারণ ওইসব নারীর কিছু ক্রেতা বিদেশি পর্যটক। দুর্বল ইয়েনের কারণে জাপান বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলনামূলক সস্তা গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশিদের এসব এলাকায় ঘোরাফেরা ও যৌনসেবা খোঁজার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে।
মানবপাচারের ঘটনা বাড়িয়েছে উদ্বেগ
বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ মানবপাচারের একটি আলোচিত ঘটনা। গত বছর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক বিদেশি কিশোরীকে উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ ছিল, তাকে জাপানে এনে জোরপূর্বক যৌনসেবার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল। এই ঘটনা যৌনবাণিজ্যের অন্ধকার দিক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
কেবল বিক্রেতা নয়, ক্রেতারাও কি দায়ী?
সাম্প্রতিক অভিযানে মূলত রাস্তায় দাঁড়িয়ে ক্রেতা খোঁজা নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নারী অধিকারকর্মীদের একটি অংশের দাবি, শুধু বিক্রেতাদের শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের মতে, যৌনসেবা কেনা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা উচিত।
এই প্রশ্ন ইতোমধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। আইনপ্রণেতারা বর্তমান ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন এবং আইন সংস্কারের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
কোন পথে যাবে জাপান?
যৌনবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা উচিত, তা নিয়ে জাপানে ভিন্নমত রয়েছে। একদল মনে করেন, যৌনসেবা কেনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত, কিন্তু সেবা প্রদানকারীদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত নয়। তাদের যুক্তি, এতে নারীদের সুরক্ষা বাড়বে।

অন্যদিকে আরেকটি পক্ষের মতে, ক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে পুরো ব্যবসা আরও গোপনে চলে যাবে। ফলে যৌনকর্মীরা সহিংসতা ও শোষণের বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। তারা বরং আইনগত স্বীকৃতি ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর পক্ষে মত দেন।
জটিল আইন ও বাস্তবতা
জাপানের যৌনবাণিজ্য খাতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর জটিল আইনি কাঠামো। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি যৌনসেবা নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম চলতে থাকে। সমালোচকদের মতে, আইনের ফাঁকফোকর এবং বেছে বেছে প্রয়োগের কারণে বাস্তবে পুরো খাতকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আপাতত সরকার মূলত প্রকাশ্য রাস্তাভিত্তিক যৌনবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণেই বেশি মনোযোগ দেবে। কারণ এটি দৃশ্যমান এবং জনমতের কাছে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদে জাপানকে যৌনবাণিজ্য, মানবপাচার, নারীর অধিকার এবং জননিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















