আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করলেও দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। একদিকে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী, অন্যদিকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের ধারাবাহিক হামলা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বেলুচিস্তানে হামলার নতুন ধাক্কা
সম্প্রতি বেলুচিস্তানে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে বোমা হামলায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। হামলার দায় নিয়েছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী, অবকাঠামো প্রকল্প এবং বিদেশি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের হামলার উদ্দেশ্য শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা নয়, বরং সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে হামলা পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে।
তালেবানপন্থী বিদ্রোহীদের উত্থান

পাকিস্তানের জন্য আরও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। সংগঠনটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে।
একসময় দুর্বল ও বিশৃঙ্খল হিসেবে পরিচিত এই গোষ্ঠী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত। তাদের হাতে আধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে এবং নতুন সদস্য সংগ্রহেও তারা সক্রিয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক প্রাণঘাতী হামলা তাদের সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আফগানিস্তানকে ঘিরে উত্তেজনা
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে সীমান্তের ওপারে থাকা জঙ্গিরা আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। এই অভিযোগের জেরে ইসলামাবাদ সামরিক অভিযান, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং বাণিজ্যিক চাপ বাড়ানোর পথও বেছে নিয়েছে।
তবে এসব পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। কিছু সময়ের জন্য হামলা কমলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও তৎপরতা বেড়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ কি বড় কারণ?

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, শুধু বাইরের শক্তিকে দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের বহু অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগও রয়েছে।
ফলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এসব অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। অনেকের মতে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান একসঙ্গে দুটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং তালেবানপন্থী বিদ্রোহ—দুই সংকটই সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা চললেও দেশের ভেতরের সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানের নেতৃত্বের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী মাসগুলোতে ইসলামাবাদ রাজনৈতিক সমঝোতা নাকি আরও কঠোর নিরাপত্তা নীতি বেছে নেয়, সেটিই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















