দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বউফোর্ট দুর্গ আবারও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। লিতানি নদীর পাশের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি শুধু অতীতের সামরিক ইতিহাসের সাক্ষী নয়, বর্তমান ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতেও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে সামরিক তৎপরতা বাড়ার পর দুর্গটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাহাড়ের উচ্চ অবস্থান থেকে উত্তর ইসরায়েল এবং বেকা উপত্যকার বিস্তৃত এলাকা নজরে রাখা যায়, যা এটিকে দীর্ঘদিন ধরে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।
ইতিহাসের বহু শাসকের পদচিহ্ন
বর্তমান বউফোর্ট দুর্গের প্রাথমিক নির্মাণ হয় দ্বাদশ শতকে। তখন এটি ‘কালাত আল-শাকিফ’ বা ‘উঁচু পাথরের দুর্গ’ নামে পরিচিত ছিল। ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা পুরোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর নতুন দুর্গ নির্মাণ করে। পরবর্তী শতকগুলোতে দুর্গটি বহুবার অবরোধ, আক্রমণ ও দখলের শিকার হয়েছে।
মিশর ও সিরিয়ার শাসক সালাহউদ্দিনের বাহিনী একসময় এটি দখল করে সীমান্ত প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। পরে মামলুক, অটোমান এবং ফরাসি প্রশাসনের সময়ও দুর্গটিতে বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্য ও সামরিক পরিবর্তন আনা হয়। ফলে বউফোর্ট আজ বিভিন্ন যুগের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়।
প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে বিশেষ গুরুত্ব
দুর্গটির এক পাশে প্রায় ৩০০ মিটার গভীর খাড়া ঢাল এবং অন্য পাশে বিস্তৃত উপত্যকা রয়েছে। এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের জন্য এটিকে দখল করা কঠিন করে তুলেছিল। একই সঙ্গে উঁচু অবস্থান থেকে নজরদারি, গোলাবর্ষণ এবং সামরিক অবস্থান গ্রহণের সুবিধা পাওয়া যায়।
এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, সামরিক কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আধুনিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দুর্গটি নতুন করে সামরিক গুরুত্ব পায়। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখানে অবস্থান নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালাত। সে সময় দুর্গের নিচে গভীর ভূগর্ভস্থ বাংকার ও কমান্ড সেন্টার নির্মাণ করা হয়।

১৯৮২ সালে ইসরায়েল লেবাননে অভিযান চালিয়ে দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে দীর্ঘ দখলদারিত্বের পর ২০০০ সালে তারা সেখান থেকে সরে যায় এবং অনেক সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে। এরপর দুর্গটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং পুনরুদ্ধার কাজ শুরু হয়।
ঐতিহ্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বউফোর্ট দুর্গকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। তবে চলমান সংঘাতের কারণে এই স্থাপনাটির সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে অবস্থান করার কারণে দুর্গটি শুধু সামরিক নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই এই প্রাচীন দুর্গ আবারও ইতিহাস ও ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে পরিণত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















