জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলার প্রযুক্তিকে একসময় বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন এক মূল্যায়ন বলছে, বাস্তবে এই উদ্যোগ এখনও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারছে না। বর্তমান গতিতে এগোলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে এই পদ্ধতির অবদান খুবই সীমিত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বন অপসারণ কার্যক্রমের পরিসর এবং গতি দুটোই এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যে মাত্রার উদ্যোগ দরকার, তার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক তৈরি হয়েছে।
কার্বন অপসারণে বড় ঘাটতি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আগামী কয়েক দশকে বিপুল পরিমাণ কার্বন অপসারণের প্রতিশ্রুতি দিলেও জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে তার চেয়েও অনেক বেশি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা সময়ের সঙ্গে আরও বাড়তে পারে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে কার্বন অপসারণের কিছু ভূমিকা অবশ্যই থাকবে। তবে এটি কখনও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নয়। বরং শিল্প, কৃষি এবং কিছু কঠিন খাতের অবশিষ্ট নির্গমন মোকাবিলার জন্য এটি একটি সহায়ক ব্যবস্থা।
প্রযুক্তি আছে, অগ্রগতি ধীর
বর্তমানে মানুষের পরিকল্পিত বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন অপসারণ করা হলেও এর বেশিরভাগই বনায়ন ও গাছ লাগানোর মতো পদ্ধতির মাধ্যমে হচ্ছে। অন্যদিকে, অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে সরাসরি বাতাস থেকে কার্বন সংগ্রহ করার প্রযুক্তির অবদান এখনও অত্যন্ত সামান্য।
যদিও এই খাত দ্রুত বাড়ছে, তবু শুরুটা এত ছোট পরিসরে হয়েছে যে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে আরও অনেক বড় বিনিয়োগ ও বিস্তৃতি প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রযুক্তিকে কার্যকর পর্যায়ে নিতে হলে সৌরবিদ্যুৎ বা বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্তারের মতো দ্রুত সম্প্রসারণ দরকার হবে।
অর্থায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা
কার্বন অপসারণ খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। বর্তমানে এই খাতের অনেক প্রকল্প সীমিত সংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠানের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিনিয়োগ কমে গেলে বা নীতিগত পরিবর্তন এলে পুরো খাতই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে কার্বন অপসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেটি তখনই সম্ভব হবে, যখন একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণও প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা যাবে।
সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই
জলবায়ু সংকট যত গভীর হচ্ছে, ততই পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কার্বন অপসারণের উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি হলেও এর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নির্গমন হ্রাসের পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কার্বন অপসারণ গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু জলবায়ু সংকট মোকাবিলার একমাত্র সমাধান নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার কেন্দ্রে থাকতে হবে নির্গমন কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















