জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে ভয়াবহ পূর্বাভাসটি এখন আর বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত বিস্তার, বিভিন্ন দেশের জলবায়ু নীতি এবং কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির গতি কমে আসার কারণে শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
তবে বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, এতে স্বস্তির সুযোগ নেই। বর্তমান নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পৃথিবী এখনও বিপজ্জনক মাত্রার উষ্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব হবে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী।
বাতিল হলো সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির পূর্বাভাস
বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ নিয়ে নতুন কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি প্রকাশ করেছেন, যা আগামী বছরগুলোর জলবায়ু গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

আগের সবচেয়ে উচ্চ নিঃসরণভিত্তিক পরিস্থিতিটি ছিল এমন একটি চিত্র, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে এবং শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক উষ্ণতা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক ওপরে পৌঁছে যায়। নতুন মূল্যায়নে সেই পরিস্থিতিকে আর বাস্তবসম্মত বলে ধরা হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কার্বন নিঃসরণ কমতে শুরু করেছে এবং চীনে তা স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব পরিবর্তন সবচেয়ে ভয়াবহ পূর্বাভাসকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তবু নিরাপদ অবস্থানে নেই পৃথিবী
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দূরে সরে গেলেও পৃথিবী এখনও নিরাপদ নয়। নতুন হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতেও শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জন করা এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বর্তমান নিঃসরণ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেই সীমা সাময়িকভাবে অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যপট অকার্যকর হয়ে গেলেও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় নিম্ন নিঃসরণ স্তরে পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

২ ডিগ্রির বেশি উষ্ণতাও হতে পারে বিপজ্জনক
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মারাত্মক প্রভাব দেখা দিতে পারে। কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় খরা বাড়বে, জনবহুল অঞ্চলে অতিবৃষ্টি বৃদ্ধি পাবে এবং বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি আরও তীব্র হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পৃথিবী মাঝারি পর্যায়ের একটি উষ্ণতার পথে এগোচ্ছে, যেখানে ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। কারণ তাপপ্রবাহ, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য চরম আবহাওয়া ঘটনার ঝুঁকি এই অঞ্চলে আরও বাড়তে পারে।

নতুন প্রশ্ন জলবায়ুর সংবেদনশীলতা নিয়ে
বিজ্ঞানীরা আরও একটি বিষয় নিয়ে সতর্ক রয়েছেন। যদি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রতি ধারণার চেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে উষ্ণতার মাত্রা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হতে পারে।
গত তিন বছরে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি অনেক গবেষককেই বিস্মিত করেছে। এই প্রবণতার কারণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব বুঝতে নতুন তথ্য ও উন্নত জলবায়ু মডেলের সাহায্যে আরও গবেষণা চালানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পূর্বাভাসের ঝুঁকি কমলেও জলবায়ু সংকট শেষ হয়ে যায়নি। বরং বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পৃথিবী এখনও গুরুতর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















