ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায় হলো শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই এবার সংগীত ও নাট্যকলার মাধ্যমে তুলে ধরেছে নতুন অপেরা ‘খেরসনের মায়েরা’। কিয়েভে এর প্রথম প্রদর্শনীতে যুদ্ধের ভয়াবহতা, মাতৃত্বের শক্তি এবং সন্তানকে ফিরে পাওয়ার সংগ্রামের গল্প দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
অপেরাটি নির্মিত হয়েছে বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে। এতে দেখানো হয়েছে দুই মা ও এক দাদির সাহসী যাত্রা, যারা নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে সন্তানদের ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খেরসন মুক্ত হওয়ার পর তারা দখলকৃত ক্রিমিয়ায় গিয়ে সন্তানদের উদ্ধার করেন।
দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথচলা

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের মতো বাস্তব জীবনেও বহু পরিবারকে হাজার হাজার কিলোমিটার ঘুরে সন্তানদের খুঁজে বের করতে হয়েছে। সামনের যুদ্ধরেখা এড়িয়ে বিভিন্ন দেশ হয়ে তাদের যাত্রা সম্পন্ন করতে হয়েছে। এই দীর্ঘ পথ শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, ছিল মানসিক যন্ত্রণারও প্রতীক।
ইউক্রেনের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ২০ হাজার শিশুকে রাশিয়ায় বা রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া বলে আসছে, শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন
অপেরাটির অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন ইউলিয়া রাদজেভিলোভা নামের এক মা। তার ছেলে যুদ্ধের সময় একটি শিবিরে কয়েক মাস আটকে ছিল। অবশেষে তিনি নিজেই গিয়ে সন্তানকে ফিরিয়ে আনেন। মঞ্চে নিজের জীবনের গল্প দেখতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
তার ছেলে স্মরণ করে, সেই সময়টাকে তার কাছে কারাগারের মতো মনে হয়েছিল। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

শিল্পের মাধ্যমে সচেতনতা
অপেরাটির নির্মাতাদের মতে, সংবাদ প্রতিবেদন মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়, কিন্তু শিল্প মানুষের আবেগকে আরও গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। সেই কারণেই তারা এই গল্পকে সংগীতনাট্যে রূপ দিয়েছেন, যাতে বিশ্বের মানুষ যুদ্ধের মানবিক ক্ষত আরও কাছ থেকে অনুভব করতে পারে।
কিয়েভে প্রদর্শিত অংশটি এখনও পূর্ণাঙ্গ নয়। আগামী মাসগুলোতে এর সম্পূর্ণ সংস্করণ মঞ্চস্থ হওয়ার কথা রয়েছে। নির্মাতারা আশা করছেন, এটি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও ইউক্রেনের মানুষের কষ্ট, সাহস এবং টিকে থাকার লড়াই তুলে ধরবে।
যুদ্ধের মাঝেও আশার গল্প
যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। অনেক শিশু এখনও পরিবারের কাছে ফিরতে পারেনি। তবুও যারা ফিরে এসেছে, তাদের গল্প অন্য পরিবারগুলোর জন্য আশার উৎস হয়ে উঠেছে। ‘খেরসনের মায়েরা’ শুধু একটি অপেরা নয়, বরং সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য মায়েদের অবিচল সংগ্রামের এক শিল্পিত দলিল।
এই প্রযোজনার মাধ্যমে আবারও উঠে এসেছে একটি বার্তা—যুদ্ধ যতই ভয়াবহ হোক, পরিবার, ভালোবাসা এবং মানবিক সম্পর্কের শক্তিকে নিঃশেষ করা যায় না।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















