ভারতের বোম্বে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জি এস প্যাটেল এবং তাঁর পরিবার গত প্রায় ১০ মাস ধরে ধারাবাহিক হুমকি ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতৃত্ব-সংক্রান্ত মামলার রায়কে কেন্দ্র করে এই ঘটনাগুলো ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ ঘটনায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিচারকের মেয়ের কাছে প্রাণনাশের হুমকিসহ একটি চিঠি পৌঁছেছে, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিচারপতি প্যাটেল জানান, তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছে যাতে তিনি ২০২৪ সালের একটি রায় প্রকাশ্যে প্রত্যাহার করেন। তবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, আদালতের রায় কোনো ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বাতিল বা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
নতুন হুমকিতে আতঙ্ক
গত ৫ জুন বিচারপতির মেয়ে অদিতি প্যাটেলের কাছে একটি বেনামি চিঠি পৌঁছায়। চিঠিতে দাবি করা হয়, পূর্বের সতর্কবার্তা অমান্য করায় তাঁর এবং পরিবারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চিঠির সঙ্গে একটি স্মৃতি কার্ডও পাঠানো হয়েছিল, যা তদন্তের জন্য পুলিশ জব্দ করেছে।
পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কায় ওই কার্ডটি খোলার চেষ্টা করেননি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করছে।

দীর্ঘদিনের চাপ ও হামলার অভিযোগ
এই হুমকি ও চাপের সূত্রপাত গত বছরের আগস্টে। সে সময় বিচারপতির স্ত্রী মুম্বাইয়ে একটি চিঠি পান। একই সময়ে লন্ডনে থাকা তাঁর মেয়েও অনুরূপ বার্তা পান। চিঠিতে বিচারকের রায় পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল। সেদিন অদিতি প্যাটেল সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সময় এক মুখোশধারী ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা চালায়। হামলায় তাঁর নাক ভেঙে যায় এবং তিনি রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে যান।
কোন রায়কে ঘিরে বিতর্ক
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। ২০১৪ সালে সম্প্রদায়ের ৫২তম ধর্মীয় প্রধানের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়।
বহু বছর শুনানির পর ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল বিচারপতি জি এস প্যাটেল রায় দেন। তিনি এক পক্ষের দাবি খারিজ করে সৈয়দনা মুফাদ্দাল সাইফুদ্দিনকে সম্প্রদায়ের বৈধ ৫৩তম ধর্মীয় প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পরাজিত পক্ষ পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে।
বিচারকের বক্তব্য

বিচারপতি প্যাটেল বলেছেন, আদালতের রায়ের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে আইনি আপিলই সঠিক পথ। তাঁর মতে, রায় প্রত্যাহারের দাবিতে ভিডিও প্রকাশের চাপ মূলত বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের পৃথক বিচারিক এখতিয়ারকে কাজে লাগিয়ে হুমকিদাতারা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। যদিও তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন, তবু পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
বিচারপতির ভাষায়, বিচারকরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালনের কারণে পরিবারসহ এমন হুমকির মুখে পড়েন, তাহলে ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে বিচারক হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কমে যেতে পারে।
তদন্ত চলছে
যুক্তরাজ্যের পুলিশ হামলা ও হুমকির ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। একই সঙ্গে ভারতেও অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এদিকে সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িত অন্য পক্ষ প্রকাশ্যে সব ধরনের হুমকি ও সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে।
এই ঘটনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচারকদের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















