ইন্দোনেশিয়ার শিল্প খাতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্পখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে, উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের উৎপাদনশীল শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার অব রিফর্ম অন ইকোনমিকসের গবেষক ইউসুফ রেন্ডি মানিলেট সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শিল্পহ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত ভর্তুকিযুক্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে বেশি দামে বিকল্প জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্প সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভর্তুকিযুক্ত গ্যাসের ঘাটতি
সরকারের নির্ধারিত প্রাকৃতিক গ্যাস মূল্য কর্মসূচির আওতায় যোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) গ্যাস ৭ ডলারে পাওয়ার কথা। কিন্তু সরবরাহ সংকটের কারণে অনেক কোম্পানিকে অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে ১১ দশমিক ৫ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত দামে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ান সিরামিকস ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এডি সুয়ান্তো জানান, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস পরিবেশক প্রতিষ্ঠান থেকে শিল্পখাতের মোট চাহিদার মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি অংশ পূরণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ ব্যয়বহুল বিকল্পের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
সিরামিক শিল্পে চাপ বাড়ছে
শিল্প সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২১ ডলারে পৌঁছায়। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গড় জ্বালানি ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অধিকাংশ সিরামিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বাড়াতে পারছে না। দুর্বল ভোক্তা চাহিদা এবং কম দামের আমদানি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে তারা অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ নিজেরাই বহন করছে। এর ফলে মুনাফার হার প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে। যেখানে এই খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক মুনাফার হার মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ।

পেট্রোকেমিক্যাল খাতেও একই সংকট
পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পও একই ধরনের চাপে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান ওলেফিন, অ্যারোমেটিক অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফাজার বুদিওনো বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস এই শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। বিশেষ করে ক্র্যাকিং ও পলিমারাইজেশন প্রক্রিয়ায় এর ব্যবহার অপরিহার্য।
তাঁর মতে, আগে ভর্তুকিযুক্ত গ্যাসের কারণে স্থানীয় শিল্প আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারত। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের দাম ১৫ থেকে ২০ ডলারের বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে এবং শিল্পের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
এর আগে ফ্ল্যাট ও সেফটি গ্লাস শিল্পের প্রতিনিধিরাও সতর্ক করেছিলেন যে ভর্তুকিযুক্ত গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যদিও চলতি বছরে ফ্ল্যাট গ্লাস উৎপাদন ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২১ লাখ ৩০ হাজার টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে, তবুও জ্বালানি সংকট শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
শিল্পখাতের নেতাদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সরকারের নজরদারির আশ্বাস
এদিকে সরকার জানিয়েছে, ভর্তুকিযুক্ত গ্যাস মূল্য কর্মসূচির বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে। শিল্পমন্ত্রী আগুস গুমিওয়াং কার্তাসাসমিতা বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সময় চালু হওয়া এই নীতি বর্তমান প্রশাসনও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়নে এখনও উন্নতির সুযোগ রয়েছে এবং সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, সরবরাহ সংকট দ্রুত সমাধান না হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং বিনিয়োগে অনীহা মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার শিল্পায়ন প্রক্রিয়া বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
গ্যাস সংকটে ইন্দোনেশিয়ার শিল্প খাত চাপে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও শিল্পহ্রাসের আশঙ্কা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















