পূর্ব আফ্রিকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা সংক্রমণ এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, বৈশ্বিক নেতৃত্বেরও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। অতীতে বড় ধরনের মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা পালন করত, এবার তা অনেকটাই সীমিত। ফলে দৃষ্টি ঘুরে গেছে চীনের দিকে। আফ্রিকায় ব্যাপক অর্থনৈতিক উপস্থিতি, রোগ নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞতা এবং শক্তিশালী জৈবপ্রযুক্তি খাত থাকার কারণে অনেকেই মনে করছেন, এই সংকটে বড় ভূমিকা নেওয়ার সক্ষমতা চীনের রয়েছে।
কঙ্গোতে বাড়ছে উদ্বেগ
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মংগবওয়ালু অঞ্চল বর্তমানে সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল। সেখানে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে জরুরি সরঞ্জাম, ওষুধ এবং পরীক্ষার উপকরণের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংক্রমণ শনাক্তের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় রোগের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাবগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
চীনের সতর্ক পদক্ষেপ
প্রাদুর্ভাব ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পর চীন পাঁচ সদস্যের একটি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ দল কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় পাঠিয়েছে। তাদের সঙ্গে ছিল সুরক্ষা সরঞ্জাম ও পরীক্ষাগার সামগ্রী। তবে আফ্রিকান দেশগুলোর পক্ষ থেকে চাওয়া বড় অঙ্কের সহায়তা নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি বেইজিং। ফলে চীনের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে যেখানে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করবে, নাকি সীমিত সহায়তার মধ্যেই থাকবে।
জৈবপ্রযুক্তি খাত হতে পারে বড় শক্তি
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমান সংকটে চীনের সবচেয়ে বড় অবদান আসতে পারে তার দ্রুত বিকাশমান জৈবপ্রযুক্তি শিল্প থেকে। বিভিন্ন রোগ শনাক্তে সক্ষম আধুনিক পরীক্ষণ প্রযুক্তি, বহুমুখী রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের পরীক্ষার কৌশল ইবোলা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে যা একই সঙ্গে ইবোলা পরিবারের একাধিক ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম। এতে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে নমুনা কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রয়োজন কমে যেতে পারে এবং রোগ শনাক্তের গতি বাড়তে পারে।

অতীতের তুলনায় বদলে গেছে পরিস্থিতি
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময় চীন শত শত চিকিৎসাকর্মী পাঠিয়েছিল এবং বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল। এমনকি বিদেশে জীবাণু নিরাপত্তা গবেষণাগার ও সংক্রামক রোগ চিকিৎসা কেন্দ্রও নির্মাণ করেছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার পরিবেশ বদলেছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, আগের মতো দ্রুত ও বড় পরিসরে পদক্ষেপ নেওয়ার আগ্রহ এখন আর ততটা স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত উপস্থিতির প্রভাব
আগের ইবোলা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় উপস্থিতি চীনকে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করেছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এবার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক কম সম্পৃক্ততা চীনের ওপর প্রতিযোগিতামূলক চাপও কমিয়ে দিয়েছে।
ফলে বেইজিং হয়তো মনে করতে পারে যে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য আগের মতো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে কঙ্গোর সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার ঝুঁকিও সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলছে।
অর্থনৈতিক স্বার্থ কি প্রধান বিবেচনা?
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিদেশে চীনের সহায়তা কার্যক্রম প্রায়ই অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কঙ্গোতে চীনা কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগ রয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে। তবে এসব খনি মূলত সংক্রমণকবলিত অঞ্চল থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি।
এ কারণে কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, চীনের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ অনেকাংশে নির্ভর করবে সংক্রমণ তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কতটা প্রভাব ফেলছে তার ওপর।
বিশ্ব যখন নতুন এক স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি, তখন চীনের সামনে প্রশ্ন একটাই—আফ্রিকার এই কঠিন সময়ে কি সে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা নেবে, নাকি সীমিত সহায়তার মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে বর্তমান ইবোলা সংকটের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গুরুত্ব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















