বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে ধীরগতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন সদ্য স্নাতক হওয়া তরুণরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মজীবনের শুরুতেই দুর্বল চাকরির বাজারের মুখোমুখি হওয়া অনেকের আয়, পদোন্নতির সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, যা নতুন কর্মীদের জন্য প্রচলিত অনেক প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কর্মজীবনের শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করা তরুণদের জন্য বর্তমান সময়টি মহামারির পর সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় অনেক স্নাতক তাদের প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ কম বেতনের প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অনেকে এমন চাকরি নিচ্ছেন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রয়োজনই নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মজীবনের শুরুতে কম মানের বা সীমিত সুযোগের চাকরিতে প্রবেশ করলে পরবর্তী সময়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথও কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব বহু বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
অতীতের বিভিন্ন অর্থনৈতিক মন্দার অভিজ্ঞতা দেখায়, দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্নাতক হওয়া ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে কম আয় করেন। অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও সেই আয়ের ব্যবধান অনেক বছর ধরে থেকে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ও উচ্চ বেতনের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত মন্দার সময় নিয়োগ কমিয়ে দেয়। ফলে নতুন স্নাতকদের ছোট প্রতিষ্ঠান বা কম বেতনের চাকরিতে যোগ দিতে হয়। এতে তাদের জীবনবৃত্তান্তে কাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা যোগ হয় না এবং ভবিষ্যতে ভালো সুযোগ পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়।
বেকারত্ব বাড়ছে তরুণদের মধ্যে
সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ স্নাতকদের বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চাকরি থাকলেও অনেকেই তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন না। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন কর্মীদের একটি বড় অংশ এমন কাজে নিয়োজিত আছেন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ছাড়াও কাজ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামগ্রিক অর্থনীতি পুরোপুরি মন্দায় না থাকলেও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য পরিস্থিতি অনেকটাই মন্দার মতো অনুভূত হচ্ছে।
![]()
দূরবর্তী কাজও তৈরি করছে নতুন বাধা
মহামারির পর দূরবর্তী কাজের প্রসার নতুন কর্মীদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কর্মজীবনের শুরুতে অভিজ্ঞ সহকর্মী ও ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ কমে গেছে। ফলে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন স্নাতকেরা পিছিয়ে পড়তে পারেন।
অনেক প্রতিষ্ঠানও মনে করছে, দূরবর্তী পরিবেশে নতুন ও অনভিজ্ঞ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। এর ফলে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা আরও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
চাকরির বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ আশঙ্কা করছেন, প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞানভিত্তিক অনেক কাজ ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। যদি এমনটি ঘটে, তাহলে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।
আরেকটি উদ্বেগ হলো, অনেক নতুন স্নাতক এমন সময়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা শেখানো ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। ফলে কয়েক বছর পর স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
তবুও উচ্চশিক্ষার মূল্য রয়েছে
সব উদ্বেগের মাঝেও অর্থনীতিবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীরা এখনো ডিগ্রিবিহীন কর্মীদের তুলনায় শ্রমবাজারে ভালো অবস্থানে আছেন। অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও তাদের বেকারত্বের হার সাধারণত কম থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের আয়ের সম্ভাবনাও বেশি।
তাই বর্তমান পরিস্থিতি কঠিন হলেও উচ্চশিক্ষা এখনো কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দেয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















