যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা এবং প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতায় সোমবার এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার, যেখানে প্রধান সূচক কসপি একদিনেই ৮ শতাংশের বেশি হারিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে তীব্র বিক্রি
সোমবার লেনদেনের শুরুতেই কসপি প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়, যার ফলে সার্কিট ব্রেকার চালু করতে হয়। দিন শেষে সূচকটি ৮.৩ শতাংশ কমে ৭,৪৮৪.৪১ পয়েন্টে দাঁড়ায়।
বাজারের বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৮ শতাংশ এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ার ১০ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছর জুড়ে ধার করা অর্থে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বাজারে অস্থিরতা আগেই বেড়েছিল। এখন সেই ঝুঁকির প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কোরিয়া ফাইন্যান্সিয়াল ইনভেস্টমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে ৪ জুন পর্যন্ত মার্জিন ঋণের পরিমাণ ৬০ শতাংশ বেড়ে ২৮ ট্রিলিয়ন ওনে পৌঁছেছে। ফলে শেয়ারমূল্য কমে গেলে বাধ্যতামূলক বিক্রির ঝুঁকিও বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর শিন হিউন-সং আগেই সতর্ক করেছিলেন যে অতিরিক্ত লিভারেজড বিনিয়োগ বাজারে পতনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে, কারণ মূল্য কমলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেয়ার বিক্রি শুরু হয়।
জাপান ও তাইওয়ানেও বড় পতন
দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি জাপানের নিক্কেই সূচকও দিনের এক পর্যায়ে ৩,১০০ পয়েন্টের বেশি বা প্রায় ৪.৮ শতাংশ নেমে যায়। শেষ পর্যন্ত সূচকটি ৩.৯ শতাংশ কমে ৬৪,০২৪.৬০ পয়েন্টে বন্ধ হয়।
সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ার ৬ শতাংশ, কিওক্সিয়া হোল্ডিংস ৮ শতাংশ, টোকিও ইলেকট্রন ৭ শতাংশ এবং অ্যাডভানটেস্ট প্রায় ৬ শতাংশ হারায়।
তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক ৩.৫ শতাংশ কমে যায়। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচকও ১ শতাংশের বেশি নিচে নামে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ
গত শুক্রবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে দেশটিতে ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার দ্বিগুণেরও বেশি।
এই শক্তিশালী কর্মসংস্থান তথ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারণা তৈরি করেছে যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে। এর ফলে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ফলন দ্রুত বেড়েছে এবং প্রযুক্তি খাতের শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেছেন।
প্রযুক্তি কোম্পানির মূল্যায়ন ভবিষ্যতের আয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় উচ্চ সুদের হার তাদের জন্য সাধারণত নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও তেলের দাম
বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন অনেক বিনিয়োগকারী।
এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারেও। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৭ ডলারে পৌঁছায়।
মুদ্রাবাজারেও চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে, যা এশিয়ার বিভিন্ন মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী কু ইউন-চল অতিরিক্ত বাজার অস্থিরতা সহ্য করা হবে না বলে সতর্ক করেছেন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ওয়নের দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য বাজার কারসাজি নিয়ে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে জাপানি ইয়েনও ডলারের বিপরীতে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ বন্ড ফলন এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ইয়েনের ওপর চাপ বজায় রাখতে পারে।
প্রযুক্তি উত্থানের পর নতুন ঝুঁকি
চলতি বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি খাতের উত্থানের কারণে পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলো বিশ্বের অনেক বাজারের তুলনায় ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছিল। তবে এখন সেই দ্রুত উত্থানের পর মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি এবং নতুন তহবিল সংগ্রহও বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং জাপানসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















