ঋণ আদায়ের জন্য সাধারণত আদালত, আইনজীবী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়ার কথা শোনা যায়। কিন্তু ভেনেজুয়েলায় এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। নিজেকে ‘ড. ডিয়াবলো’ বা শয়তান ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি প্রকাশ্যেই ঋণখেলাপিদের বিব্রত করে দেনা আদায়ের চেষ্টা করেন। আর এই অদ্ভুত পদ্ধতিই তাকে দেশজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে।
একজন আইনজীবী থেকে ব্যতিক্রমী ঋণ আদায়ক
রদ্রিগো হেরেরা নামের এই ব্যক্তি বহু বছর আগে আইন পেশায় যুক্ত হন। তবে সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন যে দেশের বিচারব্যবস্থা ধীরগতি, জটিল এবং সাধারণ মানুষের আস্থার সংকটে ভুগছে। সেই বাস্তবতা থেকেই তিনি নতুন একটি ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসেন।
নব্বইয়ের দশকে তিনি ‘ড. ডিয়াবলো’ নামে একটি ঋণ আদায় কার্যক্রম শুরু করেন। তার দাবি, শারীরিক ভয়ভীতি নয়, বরং সামাজিক অস্বস্তি ও জনসম্মুখে চাপ সৃষ্টি করেই অনেক দেনাদারকে অর্থ পরিশোধে বাধ্য করা সম্ভব।

শয়তানের সাজে রাস্তায় অভিযান
ড. ডিয়াবলোর দলটি দেখতে অনেকটা নাট্যদলের মতো। একজন সহযোগী শয়তানের বেশে হাতে ত্রিশূল নিয়ে থাকেন। আরেকজন নারী সদস্য লাল পোশাক ও শিং পরে উপস্থিত হন। অন্যদিকে হেরেরা নিজে কালো স্যুট, গাঢ় চশমা এবং আগুনের নকশাযুক্ত টাই পরে অভিযানে বের হন।
তাদের বহরেও রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। পুরোনো দুটি পিকআপ ট্রাক সাজিয়ে তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। ট্রাকগুলো রাস্তায় নামলেই মানুষের কৌতূহল তৈরি হয়। অনেকে ছবি তোলেন, আবার কেউ কেউ হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও ঘটনাটি উপভোগ করেন।
দেনাদারের কর্মস্থলেই হাজির
ড. ডিয়াবলোর অন্যতম কৌশল হলো দেনাদারের কর্মস্থল বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি হাজির হওয়া। সম্প্রতি রাজধানী কারাকাসের একটি হার্ডওয়্যার দোকানে এমনই একটি অভিযান চালানো হয়।
সেখানে গিয়ে হেরেরা দোকান মালিককে স্মরণ করিয়ে দেন যে তার এখনো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা বাকি। দোকান মালিক দাবি করেন তিনি কিস্তিতে টাকা শোধ করছেন। তবে ড. ডিয়াবলো মনে করেন সেই গতি যথেষ্ট নয়।

ঘটনাটি ঘিরে পথচারীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। অনেকেই থেমে পুরো দৃশ্য দেখেন। ফলে দেনাদারের ওপর সামাজিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে এই পদ্ধতি
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বহু মানুষ বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে হতাশ। আদালতে মামলা নিষ্পত্তি দীর্ঘ সময় নেওয়ায় বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
এই পরিস্থিতিতে ড. ডিয়াবলোর মতো উদ্যোগ কিছু মানুষের কাছে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে দ্রুত ফল পাওয়া যায় এমন পদ্ধতিতে।
তবে সমালোচকেরাও কম নন। তাদের মতে, জনসম্মুখে কাউকে বিব্রত করা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং এতে ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ব্যবসা
হেরেরার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অর্থনীতি ভালো থাকলে ঋণ গ্রহণও বাড়ে, আর সেই সঙ্গে বাড়ে ঋণ আদায়ের কাজ। একসময় তেলের আয়ে সমৃদ্ধ অর্থনীতির কারণে তার ব্যবসা বেশ সফল ছিল। পরে অর্থনৈতিক সংকট, জনসংখ্যার দেশত্যাগ এবং মহামারির কারণে কার্যক্রম অনেকটাই থমকে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার আশায় তিনি আবার সক্রিয় হয়েছেন। তার বিশ্বাস, অর্থনৈতিক লেনদেন যত বাড়বে, ঋণও তত বাড়বে, আর সেই সঙ্গে বাড়বে তার কাজের সুযোগ।
ভেনেজুয়েলার বাস্তবতায় ড. ডিয়াবলো এখন শুধু একজন ঋণ আদায়কারী নন, বরং দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সামাজিক হতাশা এবং বিকল্প ন্যায়বিচার খোঁজার এক প্রতীকী চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















