ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ফলাফল পেয়েছে, তা নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধের বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়, মানবিক ক্ষতি এবং কৌশলগত চ্যালেঞ্জের পরও ঘোষিত লক্ষ্যগুলো কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে চলছে তীব্র বিতর্ক।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলেছে। ইরান যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বিপুল ব্যয়, সীমিত অর্জন
এই সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে। এর পাশাপাশি বহু মানুষের প্রাণহানি এবং আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ইরানের ভেতরে বেসামরিক হতাহতের ঘটনাগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ হয়নি
যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি লক্ষ্য সামনে আনা হয়েছিল। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে সহায়তা করা।
তবে কয়েক মাসের সংঘাতের পরও এসব লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে সমালোচকরা দাবি করছেন। তাদের মতে, ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোও অটুট রয়েছে।
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, যুদ্ধের ফলে ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা তাকে কৌশলগতভাবে দুর্বল না করে বরং নতুন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে।

পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি?
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ইরাক আক্রমণকে পরে বহু আমেরিকান ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেও, সেই যুদ্ধের সমর্থক অনেক ব্যক্তি পরবর্তী সময়েও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সমালোচকদের মতে, অতীতের ব্যর্থ সিদ্ধান্তগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় একই ধরনের নীতি বারবার ফিরে এসেছে। ফলে সামরিক হস্তক্ষেপকে সহজ সমাধান হিসেবে দেখার প্রবণতা পুরোপুরি দূর হয়নি।
জবাবদিহির দাবি জোরালো
যুদ্ধ সমর্থনকারী রাজনীতিক, বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, শুধু ভুল স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; কেন সেই ভুল হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে তা এড়ানোর উপায় কী, সে বিষয়েও গভীর আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
তাদের যুক্তি, সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার না দিলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকটে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে বলেও মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক উদ্যোগে যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার দাবি সামনে এসেছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল শুরু। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনীতির প্রতি আরও বেশি আস্থা।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকেই দুর্বল করবে না, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনআস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















