বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন এক প্রশ্ন উঠে এসেছে—স্মার্টফোন কি মানুষের সন্তান নেওয়ার আগ্রহ ও প্রবণতা কমিয়ে দিচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত মিলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, নারীদের উচ্চশিক্ষা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রসারকে জন্মহার কমার প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছিল। তবে নতুন গবেষণাগুলো বলছে, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারও এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
জন্মহারে বড় পতনের সঙ্গে স্মার্টফোনের সম্পর্ক
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্মহার প্রায় ২২ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে স্মার্টফোনের দ্রুত বিস্তার ঘটে। গবেষকরা বিভিন্ন অঞ্চলে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ ও জন্মহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, যেখানে স্মার্টফোনের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে সেখানে তরুণদের মধ্যে জন্মহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষ করে ১৫ থেকে ১৯ বছর এবং ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই প্রভাব বেশি দেখা গেছে। বয়স্ক নারীদের মধ্যেও কিছুটা প্রভাব লক্ষ্য করা হয়েছে।

কেন ঘটছে এমন পরিবর্তন?
গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন মানুষের সামাজিক আচরণে বড় পরিবর্তন এনেছে। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ, সামাজিক মেলামেশা এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সময় ব্যয় কমেছে। একই সঙ্গে অনলাইনে বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্টে সময় ব্যয় বেড়েছে।
ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও পারিবারিক পরিকল্পনার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক পর্যায়েও মিলছে একই চিত্র
আরেকটি গবেষণায় বিশ্বের ১২৮টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, স্মার্টফোনের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ার পর অনেক দেশেই জন্মহার কমার গতি বেড়ে যায়।
গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক কাঠামোর ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে সবাই একমত নন

কিছু বিশেষজ্ঞ এই ব্যাখ্যা নিয়ে এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর-কিশোরীদের জন্মহার স্মার্টফোন যুগ শুরু হওয়ারও অনেক আগে থেকে কমছিল। তাই পুরো দায় প্রযুক্তির ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মজীবনের অগ্রাধিকার, বিয়ের বয়স বৃদ্ধি এবং সামাজিক পরিবর্তনের মতো আরও অনেক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
বিশ্বের জন্য বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশই কম জন্মহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর ফলে জনসংখ্যার গড় বয়স বাড়ছে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
চীন ইতোমধ্যে এক-সন্তান নীতি বাতিল করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া জন্মহার বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবুও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিলের মতো মধ্যম আয়ের দেশেও জন্মহার দ্রুত কমছে।
নতুন গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবার সময় হয়তো এসে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















