গাজা ও লেবাননের লাখো মানুষের কাছে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টই কখনও কখনও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। সেই পোস্টের পেছনের পরিচিত মুখ আভিচাই আদরাই। ইসরায়েলের আরবি ভাষার সামরিক মুখপাত্র হিসেবে তিনি গত দুই দশকে আরব বিশ্বে সবচেয়ে পরিচিত ইসরায়েলিদের একজন হয়ে উঠেছেন। তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনি তীব্র সমালোচনা, ক্ষোভ এবং বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দু।
সতর্কবার্তার মুখ হয়ে ওঠা
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ এবং লেবানন সংঘাতের সময় আদরাইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান বার্তাবাহক। হামলার আগে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশনা, মানচিত্র এবং সতর্কবার্তা নিয়মিত প্রকাশ করতেন তিনি।
অনেক মানুষের কাছে এসব বার্তা জীবন বাঁচানোর সুযোগ এনে দিলেও অন্যদের কাছে এগুলো ছিল নতুন দুর্যোগের পূর্বাভাস। গাজার বহু বাসিন্দা জানিয়েছেন, আদরাইয়ের নতুন পোস্ট দেখলেই তারা বুঝতেন যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান বা হামলা আসন্ন।
যুদ্ধের প্রতীক, নাকি তথ্যের সেতুবন্ধন?
আদরাই দাবি করেন, তার প্রকাশিত সতর্কবার্তাগুলো অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। তার মতে, সাধারণ মানুষকে আগাম সতর্ক করে দেওয়া সামরিক দায়িত্বেরই অংশ।
কিন্তু যুদ্ধের মানবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকরা। গাজা ও লেবাননে দীর্ঘ সংঘাতের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ নাগরিকের কাছে আদরাই এমন এক মুখ, যার সঙ্গে যুদ্ধ, উদ্বাস্তু জীবন এবং অনিশ্চয়তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
আরবি ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকে সামরিক ক্যারিয়ার
৪৩ বছর বয়সী আদরাই ইসরায়েলের হাইফা শহরে বেড়ে উঠেছেন। তার পারিবারিক শিকড় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত। ছোটবেলা থেকেই আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি পড়াশোনা এবং সামরিক গোয়েন্দা ইউনিটে কাজের মাধ্যমে আরবিতে দক্ষতা অর্জন করেন। পরে ২০০৫ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রথম আরবি ভাষার মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পরিচয়
প্রচলিত গণমাধ্যমের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান আদরাইয়ের ভূমিকা বদলে দেয়। ভিডিও, ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা, জনপ্রিয় সংস্কৃতির উল্লেখ এবং সরাসরি বার্তার মাধ্যমে তিনি বড় অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করেন।
আরবি ভাষায় সাবলীল উপস্থাপনা তাকে অন্য সামরিক মুখপাত্রদের থেকে আলাদা করেছে। অনেক সময় তিনি বিনোদনমূলক উপাদান ব্যবহার করে সামরিক বার্তা ছড়িয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে তা গ্রহণ করে।
সাংবাদিকদের নিয়ে বিতর্ক
আদরাইয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে অন্যতম বড় বিতর্ক সাংবাদিকদের ঘিরে। বিভিন্ন মানবাধিকার ও গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সংগঠন অভিযোগ করেছে, কিছু ক্ষেত্রে নিহত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়াই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও আদরাই এসব সমালোচনার অনেকটাই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, ইসরায়েল সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতেই মন্তব্য করা হয়।
অবসরের পথে নতুন অধ্যায়
দুই দশকের দীর্ঘ দায়িত্ব শেষে চলতি বছর অবসরে যাচ্ছেন আদরাই। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
বিদায়ের প্রাক্কালে আদরাই মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতাই তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। সমর্থক ও সমালোচক—উভয় পক্ষই একমত যে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের ইতিহাসে তিনি একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী মুখ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















