বেঙ্গালুরু: কর্নাটক থেকে রাজ্যসভার একমাত্র শূন্য আসনের জন্য বিজেপি অধ্যাপক এম. নাগারাজাকে মনোনয়ন দেওয়ায় জনতা দল (সেক্যুলার)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবেগৌড়ার দীর্ঘ সংসদীয় জীবনের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিজেপি যদি তাকে অন্য কোনো রাজ্য থেকে প্রার্থী না করে, তাহলে আগামী ৩০ জুন শেষ হওয়া বর্তমান মেয়াদের পর তার ৩৫ বছরের সংসদীয় পথচলার ইতি ঘটতে পারে।
বিজেপির এই সিদ্ধান্তকে দলটির নতুন মুখকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজ্যসভা আসন নিয়ে অভিনেত্রী ও সাবেক সাংসদ সুমলতা আম্বারীশ, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডি. ভি. সদানন্দ গৌড়া এবং নির্মল কুমার সুরানার নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এক শিক্ষাবিদকে বেছে নিয়েছে। ফলে দেবেগৌড়াকে নিয়ে জল্পনার অবসান ঘটেছে।
কংগ্রেসের কর্নাটক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা অভিযোগ করেছেন, বিজেপি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অসম্মান করেছে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং দেবেগৌড়ার ছেলে এইচ. ডি. কুমারস্বামী নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যস্ত। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২০ সালে দেবেগৌড়াকে রাজ্যসভায় পাঠাতে কংগ্রেস সমর্থন দিয়েছিল।
অন্যদিকে কর্নাটক বিজেপির সভাপতি বি. ওয়াই. বিজয়েন্দ্র বলেন, দেবেগৌড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন দিয়েছেন। তার প্রতি বিজেপির যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত রাজ্য নেতৃত্ব নয়, জাতীয় নেতৃত্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে নিয়েছে।
জেডিএসের ফ্লোর লিডার সুরেশ বাবুর দাবি, দেবেগৌড়া নিজে কখনো পুনরায় মনোনয়নের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তবে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আঞ্চলিক ইস্যুতে তার সক্রিয় ভূমিকার কারণে বিষয়টি জনপরিসরে আলোচনায় ছিল। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীও দেবেগৌড়ার অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতাকে সম্মান করে এসেছেন।
দলীয় সূত্রের মতে, দেবেগৌড়ার বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্নাটকে ক্ষমতায় না থাকায় ভবিষ্যতে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হলে আসন ধরে রাখা বিজেপির জন্য কঠিন হতে পারে। এছাড়া বিজেপি-শাসিত মহারাষ্ট্র থেকে রাজ্যসভায় যাওয়ার প্রস্তাবেও দেবেগৌড়া আগ্রহ দেখাননি। কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রের সীমান্ত এবং পানি বণ্টনসংক্রান্ত বিরোধ তার প্রতিনিধিত্বকে জটিল করে তুলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে তার সংসদীয় অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি নাও হতে পারে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে বিজেপির দখলে থাকা মোট ১১টি রাজ্যসভা আসন শূন্য হবে। তখন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট চাইলে দেবেগৌড়াকে আবারও সংসদে পাঠাতে পারে।
দেবেগৌড়া ১৯৯১ সালে হাসান আসন থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ওই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরে তুমাকুরু থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০২০ সালে লোকসভা নির্বাচনে হারার পর তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন।
জাতীয় রাজনীতিতে উত্থানের আগে তিনি প্রায় তিন দশক কর্নাটকের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং একাধিকবার হোলেনারসিপুর আসন থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী এবং ১৯৯৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
১৯৯৯ সালে জনতা পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর জেডিএস গঠিত হয়। ২০০৪ সালে দলটি বিধানসভায় ৫৮টি আসন জিতলেও পরে তাদের শক্তি কমতে থাকে। ২০২৩ সালের নির্বাচনে দলটির আসনসংখ্যা নেমে আসে ১৯-এ। তবু জোট রাজনীতির মাধ্যমে নিজেকে টিকিয়ে রেখে কর্নাটকের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক দল হিসেবে টিকে আছে জেডিএস।
দেবেগৌড়ার রাজনৈতিক যাত্রাও দলের এই অভিযোজন কৌশলের প্রতিফলন। একসময় বিজেপির বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এই নেতা এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অন্যতম নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। তার রাজ্যসভা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলে ভারতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগেরও অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















