ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনদানাও দ্বীপের উপকূলে আঘাত হানা ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৪৫০ জনেরও বেশি এবং অন্তত ২০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সোমবারের এই ভূমিকম্পের পর মঙ্গলবারও উদ্ধারকাজ অব্যাহত ছিল, যদিও নিখোঁজের সংখ্যা কমে চারজনে নেমে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় শহর জেনারেল সান্তোস। সাত লাখের বেশি মানুষের এই শহরে ভবন ধস ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পার্শ্ববর্তী সারাঙ্গানি প্রদেশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে গ্লান শহরের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসে বহু বাড়ি চাপা পড়ে অন্তত ১৮ জন প্রাণ হারান।
হাসপাতালের বাইরে তাঁবুতে চিকিৎসা
ভূমিকম্পে হাসপাতালগুলোর ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক রোগীকে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী তাঁবুতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জেনারেল সান্তোসের একটি হাসপাতালের বাইরে অস্থায়ী পর্দার আড়ালে এক নারী সন্তান প্রসব করেন। গ্লানের একটি হাসপাতালে ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় ৬০ জনের বেশি রোগীকে বাইরে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের কাঠামোগত ক্ষতি এতটাই গুরুতর যে ভবনের ভেতরে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যালয় ও অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষতি
সরকারি হিসাবে প্রায় দুই হাজার বাড়ি এবং ১১৭টি সরকারি ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রায় ছয় হাজার স্কুল ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত পাঠদান শুরু করা যাবে না।
ঘটনাটি ঘটে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন। সকালে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় অনেক স্থাপনা আফটারশকের কারণে আরও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
জেনারেল সান্তোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনও বন্ধ রয়েছে। এতে মানবিক সহায়তা বহনকারী ফ্লাইট ছাড়া ৬৩টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

উদ্ধারকাজে আফটারশকের বাধা
প্রথম ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়। এরপর শত শত ছোট কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, অব্যাহত কম্পনের কারণে ধসে পড়া ভবনে প্রবেশের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
সারাঙ্গানির কিছু দুর্গম এলাকা এখনও কেবল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং একটি সেতু ধসে পড়ায় কয়েকটি সম্প্রদায় অন্তত এক সপ্তাহ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তুতি
ভূমিকম্পের পর উপকূলীয় অঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ফিলিপাইন ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া ও জাপানে সতর্কতা জারি হয়। তবে কয়েক ঘণ্টা পর হুমকি কেটে গেলে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে যে ঢেউ পৌঁছেছিল তার উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটারের বেশি ছিল না।
প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মারকোস জুনিয়র রাজধানী ম্যানিলা থেকে শীর্ষ দুর্যোগ ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠিয়েছেন। তারা উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন তদারকি করছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও নিউজিল্যান্ড ফিলিপাইনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইন প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মুখোমুখি হয়। ফলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত।
ফিলিপাইনে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প
মিনদানাওয়ে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৪০ জনের বেশি নিহত, ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। হাসপাতাল, স্কুল ও অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















