সোমবারের সকালটি ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্ডানাও দ্বীপে অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। বহু শিক্ষার্থী নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনের জন্য স্কুলে যাচ্ছিল, কর্মজীবীরা কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, আর উপকূলীয় শহরগুলোতে চলছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কিন্তু সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে কয়েক সেকেন্ডের এক ভয়াবহ কম্পন সেই স্বাভাবিক জীবনকে উল্টে দেয়। সারাঙ্গানি উপকূলের কাছে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি করে মৃত্যু, ধ্বংস ও আতঙ্কের এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।
সরকারি হিসাবে, এ পর্যন্ত অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৩৪ জনেরও বেশি মানুষ এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ১২ জন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের খুঁজে বের করতে নিরন্তর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কম্পনের পরপরই কেঁপে ওঠে দক্ষিণ ফিলিপাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভূমিকম্পের পর প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একের পর এক আফটারশক অনুভূত হয়। সবচেয়ে শক্তিশালী আফটারশকের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭। ভূকম্পন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী দিনগুলোতেও আরও আফটারশক হতে পারে।
প্রথম দিনের ক্লাসে নেমে আসে বিপর্যয়
দুর্যোগটি আরও হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে কারণ এটি ঘটেছে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে। বহু স্কুলে তখন ক্লাস শুরু হয়েছিল। দাভাও দেল সুরের মাতান-আও এলাকায় একটি স্কুল ভবন ধসে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে আতঙ্কিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।
নর্থ কোটাবাটোর আমাস এলাকায় অসংখ্য অভিভাবককে সন্তানদের খোঁজে স্কুলে ছুটে যেতে দেখা যায়। খোলা মাঠে জড়ো হওয়া শিশুদের অনেকেই আতঙ্কে কান্না করছিল। অনেক অভিভাবকই বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাদের সন্তান নিরাপদ আছে কি না।

ধসে পড়ল ভবন, থমকে গেল শহর
জেনারেল সান্তোস, দাভাও, তাকুরং, কোরোনাডাল এবং আশপাশের বিভিন্ন শহরে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, জেনারেল সান্তোস শহরের একটি শপিং কমপ্লেক্সের অংশ ধসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।
কিছু এলাকায় দেয়াল ধসে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে প্রবেশে সতর্কতা অবলম্বন করছেন, কারণ অব্যাহত আফটারশকের কারণে নতুন করে ধসের ঝুঁকি রয়েছে।
সুনামির ভয়ে গণউচ্ছেদ
ভূমিকম্পের পরপরই সুনামির সতর্কতা জারি হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। উপকূলীয় এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেন। সারাঙ্গানি ও সুলতান কুদারাত অঞ্চলে অন্তত ১০ হাজার পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
উপকূলীয় কিয়াম্বা শহরে প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দা দ্রুত উঁচু এলাকায় আশ্রয় নেন। রাস্তায় দেখা যায় দীর্ঘ যানজট, পরিবারগুলোর হাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী আর শিশুদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলার দৃশ্য।
এই ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু ফিলিপাইনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতেও সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলেও সম্ভাব্য ঢেউয়ের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

জরুরি সাড়া সরকারের
প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়।
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, স্বাস্থ্য বিভাগ, জনপথ বিভাগ এবং সমাজকল্যাণ বিভাগকে উদ্ধার, ত্রাণ ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজে মাঠে নামানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহনে বিপর্যয়
ভূমিকম্পের কারণে প্রায় ৮ লাখ ৬৪ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে। হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি সেবাকেন্দ্রে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
জেনারেল সান্তোস বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোর জন্য সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। অন্তত ১৭টি ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে।

রিং অব ফায়ারের আরেকটি ট্র্যাজেডি
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত ফিলিপাইন পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। দেশটিতে প্রায় প্রতিদিনই ছোটখাটো কম্পন অনুভূত হয়। তবে সোমবারের এই ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সাম্প্রতিক বছরের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাকর্মী এবং সরকারি সংস্থাগুলো এখনও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করছে। ধ্বংসস্তূপ সরানো, নিখোঁজদের খোঁজ এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র নির্ধারণে সময় লাগবে। কিন্তু ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, ফিলিপাইনের মানুষের জন্য এটি ছিল এক শোক, আতঙ্ক ও বেদনাময় দিন—যার স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে দেশটিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















