যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যা উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনার মূল বিষয়গুলো প্রায় নির্ধারিত থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস চুক্তির পথকে জটিল করে তুলেছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুই পক্ষই যুদ্ধের পর পুরোপুরি বিজয়ী বা পরাজিত নয়। ফলে একটি সমঝোতা চুক্তি তাদের প্রয়োজন হলেও নিজ নিজ দেশের কঠোর অবস্থানের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে সেটিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক চাপ
সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারে সম্মত হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের ওপর আরোপিত অবরোধ শিথিল করার পদক্ষেপ নিতে পারে। এছাড়া দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ত্যাগ এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও থাকতে পারে।
তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো ইরানের স্থগিত সম্পদ মুক্ত করা। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের ইরানি সম্পদের একটি অংশ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
দুই নেতার ভিন্ন সংকট
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে গোপন অবস্থানে রয়েছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তার কাছে বার্তা পৌঁছাতে সময় লাগায় আলোচনার অগ্রগতিও ধীর হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও আলোচনাকে জটিল করেছে। আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার কিছু বিষয় পরে পরিবর্তিত হয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। এতে ইরানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ আরও বেড়েছে।

মধ্যস্থতাকারীদের কঠিন কাজ
তেহরান সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এতে একাধিক খসড়া নথি ঘুরে বেড়ানো এবং কোনটি কার্যকর খসড়া তা নিয়ে বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবু আলোচনায় জড়িত অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত একটি অস্থায়ী ও সীমিত সমঝোতা চুক্তি হতে পারে। কারণ দুই পক্ষই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।
অর্থনীতি বনাম সময়ের হিসাব
ইরান দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপ মোকাবিলা করছে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, তেহরানের ধারণা হলো সময় তাদের পক্ষেই রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে আবারও সীমিত হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে, তবু আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের চেয়ে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা তাদের জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















