ভারতের সর্বশেষ জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা বা এনএফএইচএস-৬ দেশের স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের বেশ কিছু ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে। শিশুদের পুষ্টি, মাতৃসেবা, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রসব এবং নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে একই সঙ্গে জরিপের প্রাথমিক তথ্যপত্রে আগের তুলনায় কম সূচক অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
২০২৩-২৪ সময়কালের এই সমীক্ষায় দেশের প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে মণিপুর এই জরিপের আওতায় ছিল না।
অগ্রগতির ইতিবাচক চিত্র
নতুন জরিপে দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো মায়ের সংখ্যা বেড়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে সন্তান জন্মদানের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি নারীদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী খর্বাকৃতির শিশুর হার কমেছে। স্বামী বা সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হওয়া নারীর সংখ্যাও আগের তুলনায় কমেছে।
কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগ
সব সূচকে অবশ্য উন্নতি দেখা যায়নি। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের একমাত্র মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর হার কমেছে। আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হারও আগের তুলনায় নেমে এসেছে।
এদিকে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত নারীর সংখ্যা দেশের প্রতিটি রাজ্যেই বেড়েছে, যা ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোন তথ্যগুলো বাদ পড়েছে?
এই জরিপের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বাদ দেওয়া। রক্তস্বল্পতা, শিশু ও নবজাতক মৃত্যুহার, জন্মের সময় লিঙ্গ অনুপাত, স্যানিটেশন সুবিধা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের মতো দীর্ঘদিনের সূচকগুলো এবার প্রাথমিক তথ্যপত্রে নেই।
আগের জরিপে ১৩১টি সূচক থাকলেও এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০১-এ। অর্থাৎ মোট ৩০টি সূচকের নিট হ্রাস ঘটেছে।
রক্তস্বল্পতা কেন বাদ?
রক্তস্বল্পতা সংক্রান্ত তথ্য বাদ দেওয়ার পেছনে মূল কারণ পরিমাপ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক। আগের জরিপগুলোতে আঙুলের রক্তের নমুনা ব্যবহার করা হতো। অনেক গবেষকের মতে, এই পদ্ধতি প্রকৃত অবস্থার তুলনায় রক্তস্বল্পতার হার বেশি দেখাতে পারে।
তাই এবার রক্তস্বল্পতা পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথক খাদ্য ও জৈবচিহ্নভিত্তিক সমীক্ষার ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে শিরা থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তথ্য নেওয়া হয়েছে, যা অধিক নির্ভুল বলে দাবি করা হচ্ছে।
নতুন সংযোজন
এনএফএইচএস-৬ শুধু কিছু সূচক বাদ দেয়নি, নতুন কিছু বিষয়ও যুক্ত করেছে। সরাসরি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যপদ, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত প্রশ্ন এবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এছাড়া নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষার ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রেও বিশেষ পরীক্ষার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
তথ্য ঘাটতির আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচক বাদ পড়ায় দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হতে পারে। শিশুমৃত্যু, জন্মের সময় লিঙ্গ অনুপাত, স্যানিটেশন সুবিধা, ক্যানসার স্ক্রিনিং বা এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতার মতো বিষয়ে এখন আর একক কোনো জাতীয় জরিপ থেকে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যাবে না।
তবে নতুন ডিজিটাল ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত তথ্য ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে এনএফএইচএস-৬ ভারতের স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের কিছু আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি তুলে ধরলেও, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচক বাদ পড়ায় তথ্যের ধারাবাহিকতা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















