বহু বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কী বলা হয়েছে তার চেয়ে কী বলা হয়নি। দুই দিনের শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত বিবৃতিগুলোতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো উল্লেখ না থাকায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
শি জিনপিংয়ের সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফর ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও পারস্পরিক প্রশংসায় ভরপুর। দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। তবে বৈঠক থেকে কোনো বড় নীতিগত ঘোষণা বা নতুন উদ্যোগ সামনে আসেনি।
পারমাণবিক ইস্যুতে নীরবতা
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে প্রকাশ্য কোনো আলোচনা না হওয়া। অতীতে বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিলেও এবার সেই বিষয়টি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা ইঙ্গিত দিতে পারে যে চীন এখন আর উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণকে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে দেখছে না। বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
যদিও সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রের কথা বলা হয়নি, সফর চলাকালে শি জিনপিং উত্তর কোরিয়ার উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রতি সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক পারমাণবিক শক্তি সম্প্রসারণ কর্মসূচিও পরোক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কিমের শক্ত অবস্থান
শীর্ষ বৈঠকের আগে ও সফরের সময় উত্তর কোরিয়ার কর্মকাণ্ডও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং প্রকাশ্যে বলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা কোনোভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয়।
এর পাশাপাশি কিম সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করেছেন, নতুন পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেছেন এবং পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন নৌবাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপের সময় নির্বাচন ছিল অত্যন্ত সচেতন এবং সম্ভবত শি জিনপিংয়ের সফরের আগে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।

নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন ইঙ্গিত
বৈঠকে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আগের সফরগুলোর তুলনায় সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবার আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীন ও উত্তর কোরিয়া উভয়েই আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। যদিও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবুও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
তাইওয়ান প্রশ্নে কিমের সমর্থন
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাইওয়ান ইস্যু। কিম জং উন প্রকাশ্যে ‘ওয়ান চায়না’ নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই নীতির আওতায় চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
যদিও উত্তর কোরিয়া অতীতেও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে, এবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দুই দেশের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার আরেকটি স্পষ্ট বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে ঘিরে অভিন্ন উদ্বেগ
সফরের সময় শি জিনপিং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি পরোক্ষভাবে আধিপত্যবাদ, শক্তির রাজনীতি এবং সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে চীন ও উত্তর কোরিয়ার উদ্বেগ এখন তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে। ফলে দুই দেশ শুধু রাজনৈতিক নয়, নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও সমন্বয় বাড়াতে আগ্রহী।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন গতি তৈরি করলেও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা এসেছে পারমাণবিক প্রশ্নে প্রকাশ্য নীরবতার মাধ্যমে। সেই নীরবতাই ভবিষ্যতে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















