দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণ পরিকল্পনা শুধু উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলার কৌশল নয়, বরং পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নৌ-নিরাপত্তা ও সামরিক ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ‘জ্যাং বোগো-এন’ কর্মসূচির আওতায় সিউল ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন বহর গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
সিউলের দাবি, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সাবমেরিনভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মোকাবিলা করা। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন এই ব্যাখ্যাকে কেবল প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখবে না। বরং তারা এটিকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বৃহত্তর আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
চীনের দৃষ্টিতে নতুন চ্যালেঞ্জ
পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিনের প্রধান সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান, অধিক গোপনীয়তা এবং বিস্তৃত অপারেশনাল পরিসর। এসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে দক্ষিণ কোরিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ও কৌশলগত সংকীর্ণ জলপথে কার্যকর উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ জেমস হোমসের মতে, চীনা সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দক্ষিণ কোরিয়ার এই সক্ষমতাকে আলাদা কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখবে না। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিত একটি বৃহত্তর আন্ডারসি প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে অকাস চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক সাবমেরিন অর্জনের পথে এগোচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নৌ-ক্ষমতা মিলিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন বহর ভবিষ্যতে চীনের সামরিক হিসাব-নিকাশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তাইওয়ান সংকট ও কৌশলগত অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি কোনো সংঘাতে অংশ না নিলেও তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা নিজেই একটি প্রতিরোধমূলক উপাদান হিসেবে কাজ করবে।
বিশেষ করে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো আঞ্চলিক সংকট দেখা দিলে চীনা কমান্ডারদের বিবেচনা করতে হবে, দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনী কোনো পর্যায়ে জড়িয়ে পড়তে পারে কি না। এই অনিশ্চয়তা সামরিক পরিকল্পনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সবাই এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক এরিক হেগিনবোথামের মতে, উত্তর-পূর্ব এশিয়ার তুলনামূলক সীমিত সামুদ্রিক পরিবেশে ডিজেলচালিত সাবমেরিনও অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম। তার মতে, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নতুন ধরনের মিশন তৈরি না করলেও দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন ও কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি সুবিধা দেয়।
![]()
জাপানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
দক্ষিণ কোরিয়ার সিদ্ধান্ত জাপানেও নতুন বিতর্ক উসকে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, টোকিওর ভেতরে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন অর্জনের পক্ষে সমর্থন আরও বাড়তে পারে।
যদিও জাপানকে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, তবুও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা দেশটিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
নতুন মডেল হিসেবে সিউলের পরিকল্পনা
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এতে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরিবর্তে নিম্নমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহারের পরিকল্পনা। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও তদারকি সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফলে এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন দেশগুলোর জন্য একটি গ্রহণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রকল্প এককভাবে আঞ্চলিক নৌ-ভারসাম্য পাল্টে দেবে না। চীনের নৌবহর এখনো সংখ্যায় বড় এবং দ্রুত আধুনিকায়নের পথে রয়েছে। তবে সামরিক প্রতিযোগিতা সাধারণত একক কোনো অস্ত্রব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং বিভিন্ন সক্ষমতার সম্মিলিত প্রভাবই দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্য নির্ধারণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচি শুধু উত্তর কোরিয়ার হুমকির প্রতিক্রিয়া নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সম্ভাব্যভাবে জাপানকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন আন্ডারসি নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















