বলিভিয়ায় টানা এক মাসের অবরোধ দেশটির সরকারকে কঠিন সংকটে ফেলেছে। রাজধানী লা পাজে খাদ্য, জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
খাদ্য ও জ্বালানি সংকট তীব্র হচ্ছে
অবরোধের কারণে রাজধানীতে তাজা খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অনেক পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক বন্ধ হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতেও অক্সিজেনের মজুত কমে আসছে, যা স্বাস্থ্যসেবার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীরা এখন পর্যন্ত আলোচনায় বসতে রাজি হননি। ফলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিবর্তনের আশা থেকে হতাশা
মাত্র সাত মাস আগে ক্ষমতায় আসেন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। প্রায় দুই দশক ধরে দেশ শাসন করা সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে ভোটাররা আগের সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
নির্বাচনের সময় ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পাজ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরও মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যার তেমন উন্নতি না হওয়ায় অনেক সমর্থক এখন হতাশ। তাদের অভিযোগ, সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
দেশজুড়ে অবরোধের বিস্তার
বর্তমানে দেশজুড়ে ৮০টিরও বেশি স্থানে অবরোধ চলছে। শ্রমিক সংগঠন, কৃষক ফেডারেশন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের সমর্থকেরা এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

বলিভিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অবরোধ নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ে এই কৌশল ব্যবহার করা হয়ে আসছে। আন্দোলনকারীরা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
আলোচনার পথ ক্রমেই সংকুচিত
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি আন্দোলনকারীদের আলোচনায় আনতেও পারে, তবু সমাধানের পথ সহজ নয়। বড় ধরনের মজুরি বৃদ্ধি বা রাজনৈতিক ছাড় দিলে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
চলতি বছরে দেশটির বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। অনেকের মনে এখনও ১৯৮০-এর দশকের উচ্চ মূল্যস্ফীতির স্মৃতি তাজা, যখন অতিরিক্ত অর্থ ছাপানোর ফলে অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল।
শক্তি প্রয়োগের দাবি বাড়ছে
অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কেউ কেউ নিজেরাই সড়ক থেকে অবরোধ সরানোর চেষ্টা করছেন, যা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।

দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর আশপাশে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিছু অবরোধ সরালেও পরদিনই সেগুলো আবার ফিরে আসে। ফলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এমন পদক্ষেপ সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতে অবরোধ ভাঙতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে এবং তা আরও বড় রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বর্তমান সরকারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনিশ্চয়তার মুখে বলিভিয়া
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। আন্দোলনের নেতৃত্ব ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবরোধ চলবে।
অন্যদিকে অর্থনীতি, ব্যবসা এবং জনজীবনের ওপর চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে। ফলে বলিভিয়া এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















