ভারত প্রথমবারের মতো ১২টি পারমাণবিক ওয়ারহেডকে সরাসরি অপারেশনাল মোতায়েন অবস্থায় রেখেছে। এতে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব ওয়ারহেড হয় ক্ষেপণাস্ত্রে সংযুক্ত রয়েছে, নয়তো এমন সামরিক ঘাঁটিতে রাখা হয়েছে যেখানে কার্যকর যুদ্ধ প্রস্তুত বাহিনী অবস্থান করছে।
বাড়ছে ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ১৭২, তা ২০২৫ সালে বেড়ে ১৮০ এবং ২০২৬ সালে ১৯০-এ পৌঁছেছে। এই প্রবণতা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ভারতের পুরো পারমাণবিক ভাণ্ডার মূলত সামরিক মজুত হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে এবার প্রথমবারের মতো কিছু ওয়ারহেডকে সরাসরি মোতায়েন অবস্থায় গণনা করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

পাকিস্তান ও চীনকে ঘিরে কৌশল
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচি ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠলেও বর্তমানে চীনের দিকে নজর বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র উন্নয়নে ভারত জোর দিচ্ছে, যাতে চীনের গভীর অভ্যন্তর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
একই সঙ্গে ভারত স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক হামলা সক্ষমতা নিয়ে তথাকথিত ‘পারমাণবিক ত্রয়ী’ গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো যে কোনো সম্ভাব্য আক্রমণের পর পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
‘প্রথমে ব্যবহার নয়’ নীতি বহাল
পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের এই পদক্ষেপের পরও ভারত তার ঘোষিত ‘প্রথমে ব্যবহার নয়’ নীতি বহাল রেখেছে। ১৯৯৮ সালের পারমাণবিক পরীক্ষার পর দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতির কথা ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ ভারত দাবি করে যে, তারা আগে থেকে পারমাণবিক হামলা চালাবে না, তবে হামলার শিকার হলে পাল্টা জবাব দেবে।

চীন ও পাকিস্তানের অবস্থান
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন গত তিন বছর ধরে ২৪টি পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন অবস্থায় রেখেছে। একই সময়ে দেশটির মোট পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৫০০ ওয়ারহেড থাকলেও ২০২৬ সালে তা ৬০০-এর বেশি হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের হাতে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেগুলোর কোনোটি মোতায়েন অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের চিত্র
২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বে মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ হাজার ১৮৭। এর মধ্যে ৪ হাজারের বেশি মোতায়েন অবস্থায় রয়েছে এবং প্রায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ ওয়ারহেড উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।

বিশ্বের অধিকাংশ উচ্চ সতর্কতায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও চীনও শান্তিকালীন সময়ে মাঝে মাঝে ক্ষেপণাস্ত্রে পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন রাখছে।
বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রই তাদের অস্ত্রভাণ্ডর আধুনিকায়নের কাজ অব্যাহত রেখেছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















