ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। টানা মেয়াদে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রেকর্ড অতিক্রম করেছেন। এ উপলক্ষে বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, মন্ত্রীরা বৈঠকে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে মোদিকে সম্মান জানাচ্ছেন। সরকার এ ঘটনাকে ভারতের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে মোদির শাসনামলকে প্রশাসনিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংস্কার, কল্যাণমূলক কর্মসূচির বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সময় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রীরা বলেছেন, তীব্র নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও একাধিক মেয়াদে জনগণের সমর্থন ধরে রাখা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ২৬ মে ২০১৪ সালে, যখন ভারতীয় জনতা পার্টি লোকসভা নির্বাচনে বড় জয় পায়। এরপর ২০১৯ সালে আরও বড় জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন এবং ২০২৪ সালে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন। নেহরুর পর তিনটি ধারাবাহিক সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের নেতৃত্ব দেওয়া দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী তিনি।
নেহরুর রেকর্ড অতিক্রম
জওহরলাল নেহরু ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সংসদীয় ঐতিহ্য এবং উন্নয়নভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে তার অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
মোদির এই নতুন রেকর্ড শুধু সময়ের হিসাব নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ইতিহাসকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের নতুন মাত্রাও যোগ করেছে। কংগ্রেস যেখানে রাষ্ট্রগঠনে নেহরুর ভূমিকার কথা তুলে ধরে, সেখানে বিজেপি মোদিকে জাতীয়তাবাদ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক উপস্থিতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে।
এক দশকের বেশি সময়ের নীতি উদ্যোগ
গত এক দশকে মোদির নেতৃত্বে পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি) চালু হয়েছে, সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। পাশাপাশি জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কার্যকর এবং ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা জোরদারের মতো পদক্ষেপও তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ভারতকে বৈশ্বিক দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে তার সরকার।
সমর্থন ও সমালোচনা
মোদির সমর্থকদের মতে, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা জনগণের অব্যাহত আস্থা এবং নেতৃত্বের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন। তাদের দাবি, তিনি বিজেপির সামাজিক ও ভৌগোলিক বিস্তার ঘটিয়ে জাতীয় রাজনীতির ধারা বদলে দিয়েছেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক ভিন্নমতের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। যদিও বিজেপি এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক
টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর নরেন্দ্র মোদি এখন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। নেহরু-পরবর্তী দীর্ঘ জোট-রাজনীতির যুগ এবং একক জাতীয় নেতার প্রভাবশালী রাজনীতির নতুন পর্যায়ের মধ্যে তিনি এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
বিজেপির জন্য এটি উদযাপনের উপলক্ষ, সমর্থকদের কাছে এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি। আর সমালোচকদের জন্য এটি এমন এক বিরোধী রাজনীতির চ্যালেঞ্জের স্মারক, যা এখনও মোদির প্রভাবের কার্যকর জবাব খুঁজে চলেছে।
বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে দাঁড়িয়ে দেওয়া সেই অভিবাদন তাই শুধু একটি রেকর্ড উদযাপন নয়, বরং ভারতের সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘতম মেয়াদ
নেহরুকে ছাড়িয়ে টানা সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির নতুন রেকর্ড ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
#নরেন্দ্র_মোদি #ভারত #জওহরলাল_নেহরু #বিজেপি #ভারতের_রাজনীতি #লোকসভা_নির্বাচন #মন্ত্রিসভা #রাজনীতি #দিল্লি #ভারতীয়_গণতন্ত্র
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















