অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেদুইন ও পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক নতুন প্রতিবেদনে দাবি করেছে, এসব সম্প্রদায়কে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করে অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
সংগঠনটির মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম তীরের গ্রামীণ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, ভূমি দখল এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে। এর ফলে বহু পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
উচ্ছেদের ঝুঁকিতে শত শত পরিবার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ অঞ্চলে অন্তত ২৭টি বেদুইন ও পশুপালননির্ভর সম্প্রদায় জোরপূর্বক উচ্ছেদ হয়েছে অথবা উচ্ছেদের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই এলাকা পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং ইসরায়েলের পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অ্যামনেস্টির অভিযোগ, বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল এবং ফিলিস্তিনি উপস্থিতি কমিয়ে আনার বিভিন্ন পদক্ষেপ একই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। সংগঠনটি বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে সমালোচনা
প্রতিবেদনে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা বাড়ানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, এসব নীতির ফলে পশ্চিম তীরে নতুন বসতি গড়ে তোলার গতি বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলি রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু প্রভাবশালী নেতাও পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, এমন বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
অ্যামনেস্টি বলছে, পশ্চিম তীর একটি অধিকৃত অঞ্চল হওয়ায় সেখানে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার দায়িত্ব ইসরায়েলের রয়েছে। কিন্তু জোরপূর্বক জনসংখ্যা স্থানান্তর, উচ্ছেদ এবং বাস্তুচ্যুতির মতো কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সংগঠনটির মতে, এসব কার্যক্রম যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। বিশেষ করে বিচ্ছিন্ন ও নিরাপত্তাহীন অবস্থানে থাকা বেদুইন সম্প্রদায়গুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাড়ছে সহিংসতার ঘটনা
মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অগ্নিসংযোগ, সম্পত্তি ধ্বংস, চুরি, হামলা এবং কিছু ক্ষেত্রে হত্যার অভিযোগও সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমিতে আগুন দেওয়া এবং ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর ওপর হামলার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ধারাবাহিক হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
ইউরোপের প্রতি চাপ বাড়ানোর আহ্বান
অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস কালামার্ড ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র প্রতীকী নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে যথেষ্ট নয়। বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
বর্তমানে পশ্চিম তীরে পাঁচ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছেন। একই অঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস। এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের অভিযোগ ঘিরে নতুন এই প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও তীব্র করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পশ্চিম তীরে বেদুইন উচ্ছেদের অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক। মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার চিত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















