যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইন্দোনেশিয়া ও চীন তাদের পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশ স্থানীয় মুদ্রা লেনদেন (এলসিটি) ব্যবস্থার সম্প্রসারণে কাজ করছে, যার মাধ্যমে ডলারকে মধ্যবর্তী মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার না করেই সরাসরি রুপিয়া ও রেনমিনবিতে লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার (বিআই) গভর্নর পেরি ওয়ারজিয়ো জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দুই দেশের মধ্যে এলসিটি ব্যবস্থায় লেনদেনের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে গত পুরো বছরে এই পরিমাণ ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির বিস্তার
পেরি ওয়ারজিয়োর ভাষ্য অনুযায়ী, রুপিয়া ও রেনমিনবিতে সরাসরি বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ নিষ্পত্তি ডলারের প্রয়োজনীয়তা আরও কমিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি সাংহাইয়ে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার গভর্নর প্যান গংশেংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তিনি দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় চুক্তির (বিসিএসএ) সীমা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।
এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে একে অপরের মুদ্রা বিনিময় করতে পারে। ফলে বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় মুদ্রার সরবরাহ নিশ্চিত হয় এবং এলসিটি কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হয়।
মুদ্রা বিনিময় চুক্তির সম্প্রসারণ
ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথম বিসিএসএ চালু করে ২০০৯ সালে। এরপর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিয়মিতভাবে চুক্তিটি নবায়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি চার বছরের জন্য নবায়ন হওয়া চুক্তির সীমা নির্ধারণ করা হয় ৪০০ বিলিয়ন ইউয়ান, যার মূল্য প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
পেরি জানান, এই সীমা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা চীনের রেনমিনবিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডলার ছাড়াই বাণিজ্যের সুবিধা
ইন্দোনেশিয়া-চীন এলসিটি ব্যবস্থার অধিকাংশ লেনদেনই বাণিজ্যভিত্তিক। এতে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানিতে ডলারের ব্যবহার কমছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থানীয় মুদ্রায় সরাসরি লেনদেনের ফলে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কমে, লেনদেন ব্যয় হ্রাস পায় এবং বিপুল পরিমাণ ডলার রিজার্ভ ধরে রাখার প্রয়োজনও কমে যায়।
একই সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পায়।
পেমেন্ট অবকাঠামোতেও সহযোগিতা
বিআই জানিয়েছে, চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রা লেনদেনকে আরও কার্যকর করতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক মন্দিরিকে চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের জন্য সিআইপিএসকে পশ্চিমা দেশনির্ভর প্রচলিত নেটওয়ার্কের একটি বিকল্প হিসেবে দেখা হয়।
এ ছাড়া সীমান্তপারের কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের সঙ্গে এ ধরনের সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা
ডলার নির্ভরতা কমানোর এই প্রচেষ্টা ব্রিকস জোটের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যেও রয়েছে। যদিও ইন্দোনেশিয়া প্রকাশ্যে কোনো আক্রমণাত্মক ‘ডি-ডলারাইজেশন’ অবস্থান নেয়নি, তবু অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মুদ্রা নিষ্পত্তিতে বৈচিত্র্য আনার নীতিই বাস্তবে ডলার নির্ভরতা কমানোর একটি রূপ।
পারমাটা ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জোসুয়া পারদেদে বলেন, লক্ষ্য ডলারকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনো একক মুদ্রার ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আন্দালাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক স্যাফরুদ্দিন কারিমি বলেন, স্থানীয় মুদ্রার তারল্য এখনো ডলারের মতো গভীর নয়। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থায়ন ও চুক্তি কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক। তাই ইন্দোনেশিয়াকে ধাপে ধাপে এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে এগোতে হবে। তার মতে, কার্যকর ডি-ডলারাইজেশনের লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা বৃদ্ধি, রুপিয়ার স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করা।
ডলার নির্ভরতা কমাতে ইন্দোনেশিয়া-চীনের স্থানীয় মুদ্রা লেনদেন
ইন্দোনেশিয়া ও চীন স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়িয়ে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ জোরদার করছে। প্রথম চার মাসেই লেনদেন পৌঁছেছে ১৩ বিলিয়ন ডলারে।
ইন্দোনেশিয়া-চীন স্থানীয় মুদ্রা লেনদেন
ডলারনির্ভর বিশ্ব অর্থনীতির বিকল্প খুঁজতে ইন্দোনেশিয়া ও চীনের নতুন পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে পারে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন কতটা বিস্তৃত হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
#ইন্দোনেশিয়া #চীন #ডিডলারাইজেশন #ডলার #রেনমিনবি #রুপিয়া #বাণিজ্য #ব্রিকস #বিশ্বঅর্থনীতি #ব্যাংকইন্দোনেশিয়া
Sarakhon Report 


















