যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস)-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাতৃত্বসেবা কেলেঙ্কারির চিত্র উঠে এসেছে একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে। তদন্তে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, অবহেলা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে শত শত নবজাতক ও মা গুরুতর ক্ষতির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে মৃত্যু, স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি এবং অন্যান্য ভয়াবহ স্বাস্থ্য জটিলতা।
নটিংহাম ইউনিভার্সিটি হসপিটালস এনএইচএস ট্রাস্টের মাতৃত্বসেবা নিয়ে পরিচালিত এই পর্যালোচনার নেতৃত্ব দেন জ্যেষ্ঠ ধাত্রী বিশেষজ্ঞ ডোনা অকেনডেন। ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে ২,৫০০-এর বেশি পরিবারের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাস্টের নেতৃত্ব বহু বছর ধরে সেবার দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
ব্যর্থতার ভয়াবহ চিত্র
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তত ৫২০টি মাতৃত্ব ও নবজাতকসংক্রান্ত ঘটনায় সেবাগত ব্যর্থতা গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে নবজাতক ও মায়েদের মৃত্যু, স্থায়ী শারীরিক জটিলতা এবং মস্তিষ্কের ক্ষতি।

অকেনডেনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ব্যর্থতাগুলো ছয়জন মায়ের এবং ১৫৬ জন শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া অনেক পরিবার এমন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে যার প্রভাব আজীবন বহন করতে হচ্ছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, হাসপাতালের কিছু কর্মী ও কর্মকর্তার আচরণ শোকাহত পরিবারগুলোর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো অভিযোগ করেছে যে তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, বরং অস্বীকার, দোষ চাপানো এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল।
‘বিষাক্ত’ কর্মপরিবেশ ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি
প্রতিবেদনে নটিংহামের দুটি মাতৃত্ব ইউনিটে একটি “বিষাক্ত বুলিং সংস্কৃতি”র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রভাবশালী কিছু নেতা রোগী ও সহকর্মীদের প্রতি ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক আচরণ করতেন, যা নিরাপদ ও মানবিক সেবা প্রদানের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তদন্ত চলাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে—৬৬ জন জ্যেষ্ঠ পরিচালকের প্রায় অর্ধেকই তদন্তে সাক্ষ্য দিতে বা নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান।
সরকারের কঠোর অবস্থান

প্রতিবেদনের পর যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে মাতৃত্বসেবা-সংক্রান্ত তদন্তে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানালে এনএইচএসের ব্যবস্থাপক, চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কারাদণ্ডের বিধানও প্রয়োগ করা হতে পারে।
স্বাস্থ্যসচিব জেমস মারে বলেছেন, নটিংহামের ঘটনায় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা গোপনীয়তা ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।
মৃতদেহ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর ত্রুটি
প্রতিবেদনে হাসপাতালের মর্গ বা মৃতদেহ সংরক্ষণ ব্যবস্থারও সমালোচনা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মৃত শিশুদের মরদেহ যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা স্বাস্থ্যসেবার মানবিক মানদণ্ড নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
পরিবর্তনের জন্য ১৮ দফা সুপারিশ
অকেনডেন জাতীয় পর্যায়ে মাতৃত্বসেবার উন্নয়নের জন্য ১৮টি সুপারিশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রোগী ও পরিবারের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, ঝুঁকি মূল্যায়নের মান একীভূত করা, নবজাতক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সেবাগত ব্যর্থতার তদন্তে পরিবারকে সম্পৃক্ত করা।

এছাড়া ইংল্যান্ডের সব মাতৃত্ব ইউনিটে “মার্থাস রুল” চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পরিবারগুলো প্রয়োজনে দ্রুত দ্বিতীয় চিকিৎসা মতামত চাইতে পারবে এবং রোগীর অবস্থার অবনতি হলে জরুরি পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করতে পারবে।
ক্ষমা চাইল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
নটিংহাম ইউনিভার্সিটি হসপিটালস ট্রাস্ট এক খোলা চিঠিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে। তারা স্বীকার করেছে যে সেবায় গুরুতর ব্যর্থতা ছিল এবং আস্থা পুনর্গঠনের জন্য আরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
ডোনা অকেনডেন বলেছেন, এই প্রতিবেদন শুধু নথিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক মাতৃত্বসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পরিবারকে একই ধরনের ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে না হয়।
নটিংহামের মাতৃত্বসেবা কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন এখন যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহি ও সংস্কারের নতুন চাপ তৈরি করেছে। আগামী দুই বছর অকেনডেনের দল সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















