কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সিঙ্গাপুরকে আরও দ্রুত অভিযোজিত হতে হবে বলে দেশটির দীর্ঘ এক বছরের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন প্রবৃদ্ধির খাত গড়ে তোলা, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, চাকরি হারানো ব্যক্তিদের দ্রুত সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি নির্মাণকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটেছে। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক পরিবেশ মৌলিকভাবে বদলে গেছে এবং ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ও জীবনমান ধরে রাখতে হলে এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
নতুন প্রবৃদ্ধির খোঁজে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়। সিঙ্গাপুরকে নতুন ও উদীয়মান খাতে বিনিয়োগ করতে হবে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোকে দেশে আকৃষ্ট করতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সাফল্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং উন্নত প্রকৌশলভিত্তিক খাতে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষাসহ উচ্চমূল্যের সেবাখাতেও বিস্তারের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সুযোগে পরিণত করার পরিকল্পনা
প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের মতো যুগান্তকারী প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি মডেল বা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামার বদলে বাস্তব সমস্যার সমাধান তৈরির নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ জন্য শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ জনশক্তিকে আকৃষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবেশ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সহজে প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে, সে জন্য সমন্বিত সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
কর্মীদের জন্য নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা
প্রতিবেদনটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়। এতে বলা হয়েছে, এমন প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে যা কর্মীদের প্রতিস্থাপন না করে তাদের সক্ষমতা বাড়ায়।
মানবিক বিচারবোধ, যোগাযোগ, আস্থা ও সম্পর্কভিত্তিক পেশাগুলো ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা এবং সামাজিক সেবার মতো খাতে আরও ভালো কর্মপরিবেশ ও মজুরি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় থাকা কর্মীদের জন্য নতুন পেশায় যাওয়ার পথ তৈরি এবং চাকরি হারানোর আগেই সহায়তা কার্যক্রম শুরু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মীরা চাকরি হারানোর পর নয়, বরং সম্ভাব্য ছাঁটাইয়ের আগেই সহায়তা পেলে নতুন কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়।
জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে সমুদ্র ও বিমান পরিবহন খাতে ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। লক্ষ্য হলো পণ্য পরিবহনে অঞ্চলটির সবচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করা।
এ ছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া এবং টেকসই বিমান জ্বালানির মতো উদীয়মান জ্বালানি খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিম্ন-কার্বন প্রযুক্তির পরীক্ষাগার হিসেবেও শিল্পাঞ্চলগুলোকে উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ
প্রতিবেদনে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিনিয়োগ সুবিধা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি মূলধনের নতুন উৎস তৈরি, অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ এবং বিদেশে ব্যবসা বিস্তারের জন্য সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বেশি স্থানীয় কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, নতুন প্রবৃদ্ধির খাত তৈরি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, কর্মীদের রূপান্তরকালীন সহায়তা জোরদার করা এবং জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলেই আগামী দশকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সিঙ্গাপুর টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখতে পারবে।
সিঙ্গাপুরের নতুন অর্থনৈতিক কৌশলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন প্রবৃদ্ধির খাতে বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















