গ্রীষ্ম মানেই আমের মৌসুম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা জাতের আমের সমারোহ দেখা যায়। কিন্তু সুস্বাদু এই ফল গাছে কীভাবে তৈরি হয়, তার পেছনে যে অসংখ্য বুনো পোকামাকড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তা অনেকেরই অজানা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমের ফুলে বুনো পোকামাকড়ের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা হলে ফলন প্রায় ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
গবেষণার ফলাফল নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, কৃষি উৎপাদনে পরাগায়নকারী প্রাণীদের গুরুত্ব কতটা গভীর এবং তাদের সংরক্ষণ কেন জরুরি।
পরাগায়ন ছাড়া আম নয়
প্রতি বছর শীতের শেষ থেকে বসন্তের শুরু পর্যন্ত আমগাছে মুকুল আসে। একটি মুকুলে শত শত থেকে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ফুল থাকতে পারে। এসব ফুলের মধ্যে পরাগ স্থানান্তরের মাধ্যমেই ফল গঠন শুরু হয়।
একসময় ধারণা করা হতো, বাতাসই আমের পরাগায়নের প্রধান মাধ্যম। তবে বিজ্ঞানীরা পরে দেখেছেন, আমের ফুলের মিষ্টি গন্ধ মূলত বিভিন্ন পোকামাকড়কে আকর্ষণ করার জন্য। এসব পোকামাকড় ফুল থেকে ফুলে পরাগ বহন করে নিয়ে যায় এবং ফল গঠনে সহায়তা করে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
গবেষকরা কয়েকটি আমবাগানে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখেন, যেখানে মৌমাছি, মাছি এবং অন্যান্য উড়ন্ত পোকামাকড়ের প্রবেশাধিকার ছিল, সেখানে ফলনের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণায় বিশেষভাবে বুনো মৌমাছি, হোভারফ্লাই, গৃহমাছি এবং আরও কিছু স্থানীয় প্রজাতির পোকামাকড়কে কার্যকর পরাগবাহক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি পিঁপড়ার মতো হামাগুড়ি দেওয়া প্রাণীরাও কিছু ক্ষেত্রে পরাগায়নে ভূমিকা রাখে বলে গবেষকরা মনে করছেন।

স্থানীয় প্রজাতির গুরুত্ব বেশি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণাগুলোও একই ধরনের ফল দেখিয়েছে। দেখা গেছে, স্থানীয় বা দেশীয় পরাগবাহক পোকামাকড় অনেক সময় বাইরের প্রজাতির তুলনায় বেশি কার্যকর।
স্থানীয় মৌমাছি সাধারণত এক বাগান থেকে অন্য বাগানে পরাগ বহন করে নিয়ে যায়। ফলে ফলের আকার, গঠন ও মান উন্নত হয়। অন্যদিকে কিছু বিদেশি প্রজাতি একই গাছ বা একই বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা সবসময় ভালো ফলনের নিশ্চয়তা দেয় না।
কী হুমকির মুখে পরাগবাহকরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমের ফলন বাড়াতে ব্যবহৃত অনেক কীটনাশকই পরাগবাহক পোকামাকড়ের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে কিছু রাসায়নিক মৌমাছির স্মৃতিশক্তি, দিকনির্ণয় ক্ষমতা এবং বেঁচে থাকার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এর ফলে মৌমাছির সংখ্যা কমে যায়, পরাগায়ন ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত কৃষকের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে পরাগবাহক কম ছিল, সেখানে সংগ্রহ করা ফলের ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
সংরক্ষণে নতুন ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ, বুনো ফুলের আবাস তৈরি এবং নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে পরাগবাহক প্রাণীদের রক্ষা করা সম্ভব। কৃষিজমির আশপাশে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল বা সবুজ এলাকা থাকলে বুনো মৌমাছি ও অন্যান্য উপকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা বাড়তে পারে।
কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে পরাগবাহকদের অর্থনৈতিক মূল্যও এখন নতুন করে বিবেচনায় আসছে। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা ও ফলন বৃদ্ধিতে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমের প্রতিটি মিষ্টি স্বাদের পেছনে তাই শুধু কৃষকের পরিশ্রম নয়, প্রকৃতির অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীরও অবদান লুকিয়ে আছে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আমসহ নানা ফসলের উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।
আমের ফলন বাড়ায় বুনো পোকামাকড়, গবেষণায় মিলেছে চমকপ্রদ তথ্য। পরাগবাহক প্রাণী সংরক্ষণে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















