তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের অবসান ঘটাতে করা চুক্তিকে “আমেরিকার পরাজয়ের ঘোষণা” হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় দেশগুলো সফর শুরু করেছেন, যার লক্ষ্য ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ শেষ হয়েছে একটি সমঝোতার মাধ্যমে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাধা সৃষ্টি করে এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের দিকে হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে নতুন প্রক্রিয়া শুরু করে। ইরানের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা বহাল রয়েছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চূড়ান্ত হওয়া “ইসলামাবাদ সমঝোতা” কোনো চাপ বা জোরজবরদস্তির ফল নয়, বরং ইরানি জনগণের প্রতিরোধ ও সক্ষমতার প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, “এ কারণেই ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক আমেরিকার পরাজয়ের ঘোষণায় পরিণত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অঞ্চলটির দেশগুলোরই হওয়া উচিত।
উপসাগর সফরে রুবিও
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে। এই প্রেক্ষাপটে রুবিও ২৪ জুন সফর শুরু করেন। তিনি ২৩ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি কুয়েত ও বাহরাইন সফরে যান, যেখানে তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বৈঠকে অংশ নেবেন।
রুবিও জানান, তিনি উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে এই সমঝোতায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়ে গেছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন বিতর্ক
রুবিও জোর দিয়ে বলেন, কোনো দেশই আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলের জন্য টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না। তাঁর এই মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন ওমান ও ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কিছু খরচ আরোপের বিষয় বিবেচনা করছে।
রুবিও বলেন, “এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশ সেখানে টোল আদায় করতে পারে না।”
একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তেহরান ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করেছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো টোল, বীমা খরচ বা অতিরিক্ত ফি আদায়ের পরিকল্পনা নেই।
আবার চলতে শুরু করেছে জাহাজ
জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থার নতুন উদ্যোগের আওতায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবার জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। সংঘাতের কারণে আটকে পড়া শত শত জাহাজ এবং প্রায় ১১ হাজার নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
জাহাজ পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুটি শুকনো পণ্যবাহী জাহাজ ও একটি মালবাহী জাহাজ ইতোমধ্যে এই রুট ব্যবহার করেছে। আরও অন্তত ৩৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালী অতিক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লেবানন ও পারমাণবিক ইস্যু
গালিবাফ বলেন, লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর একটি মৌলিক শর্ত। তাঁর মতে, “লেবাননের যুদ্ধের অবসান আমাদের কাছে ইরানের যুদ্ধের অবসানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”
পাকিস্তান জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু হবে।
অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনও আলোচনার অন্যতম জটিল বিষয়। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, যদিও ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান জাতিসংঘের পরিদর্শকদের ফের দেশটিতে কাজ করার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান বলেছে, এমন কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
তবু আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি ২৪ জুন বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শন “অবশ্যই হবে”। তাঁর ভাষায়, “আজ, আগামীকাল বা ১০ দিন পরে—সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মূল বিষয় হলো পরিদর্শন শেষ পর্যন্ত হবে।”
সিঙ্গাপুরের দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের প্রতিবেদন 



















