মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক অস্থিরতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ চীন সাগরে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর আচরণবিধি চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে আসিয়ান। সংগঠনটির বর্তমান চেয়ার দেশ ফিলিপাইন মনে করছে, এ চুক্তি শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারো বলেছেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে সংঘাত ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় দক্ষিণ চীন সাগরে সুস্পষ্ট নিয়মভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। তার মতে, এই আচরণবিধি চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা পুরো বিশ্বের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হবে।
দুই দশকের বেশি সময়ের আলোচনা
দক্ষিণ চীন সাগরে আচরণবিধি চুক্তি নিয়ে আসিয়ান ও চীনের আলোচনা চলছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে চীনের দাবির সংঘাত এই অঞ্চলের অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক ইস্যু।
ফিলিপাইন চলতি বছর আসিয়ানের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকেই ২০২৬ সালের মধ্যেই চুক্তিটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দেশটি বারবার জোর দিয়ে বলছে, চুক্তিটি অবশ্যই আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব
এ বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দেয়। তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বুঝতে পারে, দূরবর্তী অঞ্চলের সংঘাতও তাদের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা আসিয়ান নেতাদের মধ্যে সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখন নিয়মিত বৈঠক করছেন আলোচকরা।
তবে এখনও অমীমাংসিত কয়েকটি বিষয় রয়ে গেছে। চুক্তির আইনগত বাধ্যবাধকতা, ভৌগোলিক সীমা, পূর্ববর্তী সমঝোতার সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা
দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুর পাশাপাশি সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগও বাড়িয়েছে আসিয়ান। সদস্য দেশগুলো যৌথ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা, জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে।
যদিও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত, তবু আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য বাড়ছে।
মিয়ানমার সংকটও রয়ে গেছে চ্যালেঞ্জ
আসিয়ানের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকট। সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পরও দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফেরেনি। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ঘোষিত পাঁচ দফা ঐকমত্য এখনও আসিয়ানের প্রধান কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফিলিপাইন বলছে, মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি বোঝার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া হবে। তবে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণের আগে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করতে চায় তারা।
কূটনীতি ও নিরাপত্তা নীতির ভারসাম্য
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ফিলিপাইনের ভেতরেও ভিন্নমত রয়েছে। একদিকে কূটনৈতিক সংলাপকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা মহল আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে। তবে সরকার বলছে, বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংলাপই প্রধান পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বছরের শেষ দিকে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিতব্য আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনের আগে দক্ষিণ চীন সাগর আচরণবিধি চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি অর্জন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা দেখানোই এখন ফিলিপাইনের প্রধান লক্ষ্য।
দক্ষিণ চীন সাগর আচরণবিধি চুক্তি ও হরমুজ সংকটের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি ঝুঁকি এবং আসিয়ানের নতুন উদ্যোগ নিয়ে বিশদ প্রতিবেদন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















