একটি রসিকতায় কেউ হেসে গড়াগড়ি খায়, আবার কেউ নির্বিকার থাকে। কিন্তু হাসি এমন এক মানবিক বৈশিষ্ট্য, যা পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান। নতুন এক গবেষণা বলছে, শুধু মানুষই নয়, শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বনোবো ও ওরাংওটানের মতো বৃহৎ বনমানুষও একই ধরনের ছন্দময় পদ্ধতিতে হাসে। গবেষকদের মতে, এই মিল মানুষের হাসির বিবর্তনের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা শিশু ও বিভিন্ন প্রজাতির বনমানুষের হাসির শব্দ বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণাটি দেখায়, মানুষের হাসি অন্যান্য বনমানুষের হাসির সঙ্গে মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য ভাগাভাগি করলেও মানুষের হাসি তুলনামূলকভাবে দ্রুত, বৈচিত্র্যময় এবং পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তনশীল।
হাসির বিবর্তনের সূত্র
গবেষকরা চারজন শিশু এবং ১৩টি অল্পবয়সী বনমানুষের হাসির রেকর্ড বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ছিল চারটি ওরাংওটান, দুটি গরিলা, তিনটি বনোবো এবং চারটি শিম্পাঞ্জি। কিছু রেকর্ডে খেলাধুলার সময়ের হাসি ছিল, আবার কিছুতে গুদগুদির প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট হাসি ধরা পড়ে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুদগুদির সময় সব প্রজাতির হাসির মধ্যে একটি অভিন্ন ছন্দ রয়েছে। প্রতিটি শব্দ বা ধ্বনি প্রায় সমান সময়ের ব্যবধানে উচ্চারিত হয়। গবেষকরা একে ‘আইসোক্রোনাস’ ছন্দ বলে উল্লেখ করেছেন, যা ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দের মতো নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক।
তবে খেলাধুলার সময় এই নিয়মিততা ততটা স্পষ্ট ছিল না। গবেষকদের ধারণা, শারীরিক নড়াচড়া ও অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে খেলাধুলার সময় হাসির ছন্দ ভেঙে যেতে পারে।
মানুষের হাসি কেন আলাদা
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের হাসি অন্যান্য বনমানুষের তুলনায় গড়ে দ্রুত। পাশাপাশি মানুষের নিকটাত্মীয় শিম্পাঞ্জি ও বনোবোর হাসির গতি গরিলা ও ওরাংওটানের তুলনায় বেশি।
তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মানুষই একমাত্র প্রজাতি যার হাসির গতি পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায়। গুদগুদি দিলে মানুষ সাধারণত দ্রুত হাসে, আবার অন্য পরিস্থিতিতে ধীর বা সংযতভাবে হাসতে পারে। অন্যদিকে বনমানুষের হাসির ধরন তুলনামূলকভাবে স্থির ও কম পরিবর্তনশীল।
গবেষকদের মতে, এই নমনীয়তা মানুষের কণ্ঠনিয়ন্ত্রণ ও স্বর ব্যবহারের উন্নত ক্ষমতার প্রতিফলন। একই দক্ষতা মানুষের ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়।
যোগাযোগের শক্তিশালী মাধ্যম
গবেষণার অন্যতম গবেষক কিয়ারা ডে গ্রেগোরিওর মতে, মানুষের হাসি শুধু আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম নয়। এটি সামাজিক সম্পর্ক, সৌজন্য, অস্বস্তি কিংবা ব্যঙ্গ—বিভিন্ন ধরনের বার্তা বহন করতে পারে। কখনও মানুষ ভদ্রতার খাতিরে হাসে, আবার কখনও এমনভাবে হাসে যাতে বোঝা যায় সে আসলে মজা পায়নি।
গবেষকরা মনে করেন, হাসি মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু “আমি আনন্দ পাচ্ছি” এই বার্তা দেয় না, বরং সামাজিক সম্পর্ক ও আবেগ প্রকাশের আরও জটিল ভূমিকা পালন করে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষণাটির নমুনা সংখ্যা তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল এবং হাসির সব বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরের গবেষণা মানুষের হাসির বিবর্তন ও ভাষা বিকাশের সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচন করবে।
এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মানুষের হাসি এবং বনমানুষের হাসির মধ্যে একটি গভীর বিবর্তনীয় সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, মানুষের হাসি সময়ের সঙ্গে এমন এক জটিল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিকশিত হয়েছে, যা অন্য কোনো প্রজাতির মধ্যে দেখা যায় না।
গুদগুদির সময় মানুষ ও বনমানুষের হাসির মিল খুঁজে পাওয়া সেই দীর্ঘ বিবর্তনীয় যাত্রারই একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।
মানুষ ও বনমানুষের হাসির বিবর্তনের ছন্দ উন্মোচন করেছে নতুন গবেষণা। গুদগুদির প্রতিক্রিয়ায় পাওয়া মিল বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন দিগন্ত।
#হাসি #বিবর্তন #বনমানুষ #শিম্পাঞ্জি #গরিলা #বিজ্ঞান #গবেষণা #মানুষেরহাসি #প্রাণীবিজ্ঞান #সারাক্ষণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















