দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পের আঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন, হাজারের বেশি আহত হয়েছেন এবং বহু ভবন ধসে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারি হিসাবে অন্তত ২৩৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৫২০ জন। তবে উদ্ধারকাজ চলতে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত উপকূলীয় অঞ্চল
রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১০৫ মাইল দূরে ইয়ারাকুই রাজ্যে ছিল ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় লা গুইরা অঞ্চল, যা রাজধানীর প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
সেখানে শতাধিক আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ধসে গেছে। জনপ্রিয় একটি ১০৫ কক্ষের হোটেল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ধসে পড়া ভবনগুলোর নিচে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অনেক পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের খুঁজে ফিরছে। অনানুষ্ঠানিক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ৪৩ হাজারের বেশি নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য জমা পড়েছে, যদিও এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

উদ্ধারকাজে চরম সংকট
ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবলের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা মানুষের আর্তনাদ শোনা গেলেও দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও ও বার্তায় স্থানীয়দের অসহায় পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।
কারাকাসের বাসিন্দা কারমেন দে লা রোসা বলেন, ভূমিকম্পের পর তিনি সারা রাত খোলা আকাশের নিচে কাটিয়েছেন। নিজের বাসভবন অক্ষত থাকলেও আশপাশের বহু ভবন ধসে পড়তে দেখেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তুতি
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যে বিশেষায়িত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। নেদারল্যান্ডস জরুরি অর্থসহায়তা ও অনুসন্ধানী কুকুর দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। জার্মানি সামরিক পরিবহন বিমান দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে স্যাটেলাইট সহায়তা চালু করেছে। ভারত ও চীনও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তারা একটি সমন্বিত মানবিক সহায়তা কর্মসূচি প্রস্তুত করছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হবে দ্রুত, বড় পরিসরের এবং কার্যকর।
বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত, বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজধানীর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি। ভূমিকম্পের সময় টার্মিনালের ছাদে ফাটল দেখা দেয় এবং ধুলাবালু ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ অবস্থায় বিদেশি সহায়তা ও উদ্ধার সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কেন এত ভয়াবহ ছিল এই ভূমিকম্প?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় ভেনেজুয়ায় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। এবার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে পড়া অনেক ভবন দ্বিতীয়, আরও শক্তিশালী কম্পনে সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। এ কারণেই প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি এত ব্যাপক হয়েছে।
ভেনেজুয়ায় ১৯৬৭ সালের ৬.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে এবারের বিপর্যয় সেই ঘটনার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ভেনেজুয়েলার জোড়া ভূমিকম্পে শতাধিক নিহত, হাজারো মানুষ আহত ও নিখোঁজ। উদ্ধারকাজের সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
#ভেনেজুয়েলা #ভূমিকম্প #কারাকাস #লা_গুইরা #প্রাকৃতিক_দুর্যোগ #উদ্ধার_অভিযান #আন্তর্জাতিক_সহায়তা #লাতিন_আমেরিকা #বিশ্বসংবাদ #সারাক্ষণReport
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















