অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো উচ্চমাত্রার সংক্রামক এইচ৫এন১ (H5N1) বার্ড ফ্লু ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে ভাইরাসটি সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়াসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে নজরদারি ও জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর এসপেরেন্সে একটি অসুস্থ পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির শরীরে এইচ৫এন১ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর গত শনিবার দেশটির কর্তৃপক্ষ প্রথম সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপর বুধবার পর্যন্ত আরও দুটি বন্য পাখির মধ্যে ভাইরাসটি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে একটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়।
পোলট্রি খাতে বাড়ছে শঙ্কা
বার্ড ফ্লু বন্য পাখি ও খামারের মুরগির মধ্যে ব্যাপক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। যদিও মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল, তবুও বিশ্বজুড়ে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে শত শত কোটি পাখি নিধন করতে হয়েছে। এর ফলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বৃহৎ পোলট্রি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইনঘামস সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার তাদের ব্রিডার খামারগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। অপ্রয়োজনীয় প্রবেশও সীমিত করা হয়েছে। তবে দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারগুলোতে বার্ড ফ্লুর কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সতর্কতা
ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশগুলোও সতর্কতা বাড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান পোলট্রি পণ্যের বড় আমদানিকারক দেশ পাপুয়া নিউগিনি আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়া থেকে পোলট্রি আমদানির ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তবে দুই দেশের আলোচনার পর এসব বিধিনিষেধের কিছু অংশ শিথিল করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষিমন্ত্রী জুলি কলিন্স বলেছেন, দেশটির পোলট্রি বা কৃষি ব্যবস্থায় এইচ৫ ভাইরাসের কোনো প্রমাণ নেই। এছাড়া বন্য প্রাণীদের মধ্যে ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা বা ভাইরাসের বিস্তৃত ছড়িয়ে পড়ারও কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত শনাক্ত সব ঘটনাই পরিযায়ী পাখির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এদিকে নিউজিল্যান্ডও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। দেশটির বায়োসিকিউরিটি কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে অসুস্থ বা মৃত বন্য প্রাণী থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে খামার মালিকদের পাখির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, বন্য পাখির সংস্পর্শ এড়ানো এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সমুদ্রসীমা ভাগাভাগি করা ইন্দোনেশিয়াকেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বোগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুষদের জেনেটিক্স অধ্যাপক রনি রহমান নূর।
তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া গুরুত্বপূর্ণ পরিযায়ী পাখির চলাচলপথের মধ্যে অবস্থিত। দেশটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বার্ড ফ্লুর অভিজ্ঞতা বহন করছে এবং অতীতে পোলট্রি খাতে একাধিক প্রাদুর্ভাব ও মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
তার মতে, নতুন কোনো প্রাদুর্ভাব ইন্দোনেশিয়ার পোলট্রি শিল্পে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, যা দেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের উৎস। এজন্য বন্য পাখির ওপর নজরদারি বাড়ানো, খামারে উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, গৃহপালিত ও বন্য পাখির সংস্পর্শ সীমিত করা এবং পোলট্রি পরিবহনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, খামারিদের বার্ড ফ্লুর লক্ষণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সন্দেহজনক ঘটনা দ্রুত রিপোর্ট করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি, যাতে সম্ভাব্য সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
সতর্কতা বাড়ালেও নিষেধাজ্ঞা নয়
অস্ট্রেলিয়ায় ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পরও ইন্দোনেশিয়া এখন পর্যন্ত নতুন কোনো আমদানি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেনি। তবে দেশটির কোয়ারেন্টিন সংস্থা বারান্তিনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।
সংস্থাটির প্রাণী কোয়ারেন্টিন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনেস দোনি ক্রিসওতো বলেছেন, এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্ড ফ্লু বহনকারী কোনো পোলট্রি বা পোলট্রি পণ্য ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করেনি। তবে যাত্রীদের লাগেজ ও প্রবেশপথে তল্লাশি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ায় এইচ৫এন১ শনাক্ত হওয়ার পর পুরো অঞ্চলে সতর্কতা বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে।
অস্ট্রেলিয়ায় এইচ৫এন১ শনাক্তের পর ইন্দোনেশিয়াসহ প্রতিবেশী দেশগুলো নজরদারি ও জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
#বার্ডফ্লু #H5N1 #অস্ট্রেলিয়া #ইন্দোনেশিয়া #পোলট্রি #স্বাস্থ্যঝুঁকি #পরিযায়ীপাখি #এশিয়াপ্যাসিফিক
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















