এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের গল্প বহু বছর ধরে একটি বড় শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—তরুণ জনগোষ্ঠী। বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করেছে, উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়াকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জন্মহার কমছে, মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, আর একই সঙ্গে জনসংখ্যার বড় অংশ প্রবীণ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন শুধু শ্রমবাজার বা সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের সক্ষমতাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর একটি ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, আধুনিক বিদ্যুৎ গ্রিড, বৈদ্যুতিক যানবাহনের অবকাঠামো কিংবা হাইড্রোজেনভিত্তিক জ্বালানি—সবকিছুর জন্য প্রয়োজন বিপুল সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের অর্থের বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় হতে শুরু করে, তখন সবুজ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। সংস্থাটির মতে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। একই সময়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য ও পেনশন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশ—দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
এই সংকট শুধু অর্থের নয়, মানুষেরও। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপক এবং প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি অপরিহার্য। কিন্তু কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে গেলে সেই মানবসম্পদও সংকুচিত হবে। অর্থাৎ অর্থায়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের গতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে প্রায় প্রতি কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে একজন প্রবীণ নির্ভরশীল থাকবেন। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে সাধারণত একজন অবসরপ্রাপ্ত নাগরিককে চার বা পাঁচজন কর্মজীবী মানুষ সমর্থন করেন। সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে উৎপাদনশীলতা, কর আদায় এবং সামাজিক ব্যয়ের মধ্যে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়।
ভিয়েতনামও দ্রুত একই বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। একসময় তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচিত দেশটি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের আগেই জনসংখ্যা বার্ধক্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি এমন এক প্রতিযোগিতা, যেখানে সময়ের আগে ধনী হতে না পারলে ভবিষ্যতের ব্যয় বহন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের সামনে সমস্যা আরও জটিল। কারণ তাদের মাথাপিছু আয় সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে উন্নত দেশগুলো জনসংখ্যার বার্ধক্যের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়েছিল। অর্থাৎ সীমিত সম্পদ নিয়েই তাদের একদিকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বড় বিনিয়োগও চালিয়ে যেতে হবে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। প্রবীণদের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মজীবী মানুষের ওপর করের চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে সরকার যদি উন্নয়নমূলক ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়, তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। ফলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাপান এই বাস্তবতার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদাহরণ। বহু বছর ধরেই দেশটি দ্রুত বার্ধক্যের সঙ্গে বসবাস করছে। রোবট প্রযুক্তির বিস্তার, বিদেশি শ্রমিক গ্রহণ এবং বিভিন্ন আর্থিক নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। ফলে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অনেক সমস্যা কমাতে পারে, কিন্তু জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের আর্থিক প্রভাব পুরোপুরি দূর করতে পারে না—জাপানের অভিজ্ঞতা সেটিই দেখায়।
চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু একই সময়ে দ্রুত বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং কমতে থাকা কর্মক্ষম জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জন্মহার বৃদ্ধির জন্য সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোও এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন।
অবশ্য এই বাস্তবতা মানেই এশিয়ার সবুজ রূপান্তর থেমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের খরচ ক্রমেই কমছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ভবিষ্যতে আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী সমাধান এনে দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতি তখনই কার্যকর হবে, যখন সরকারগুলোর হাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা থাকবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির চেয়ে অর্থনীতির। আগামী কয়েক দশকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইও থেমে না যায়। কারণ জনসংখ্যাগত সুবিধার যুগ শেষ হয়ে এলে সবুজ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লড়াই আরও ব্যয়বহুল, আরও কঠিন এবং আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠবে।
টিম ডেইস 


















