ভারতের রাজনীতিতে দুর্নীতি কখনও নতুন বিষয় ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা এমন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে, যেখানে দুর্নীতি আর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়; বরং প্রশাসনিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংকটকে একসঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল ‘স্বচ্ছ শাসন’ ও ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’, আজ সেই প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা ঘটনাগুলো—ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম, ভূমি লেনদেন নিয়ে ক্ষমতাসীন নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট এবং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ—সব মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে: ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, জবাবদিহি কি ততটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে?
ভারতের কিছু রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল ‘ডাবল-ইঞ্জিন সরকার’-এর ধারণাকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলে উন্নয়নের গতি বাড়ে—এটাই এই রাজনৈতিক বার্তার মূল কথা। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার ঘনত্ব বাড়লে অনেক ক্ষেত্রে নজরদারি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
![]()
অযোধ্যার রাম মন্দিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ভক্তদের দেওয়া স্বর্ণ, রৌপ্য, গয়না ও নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং প্রশাসনিক দায়িত্ব ও তদারকির সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। এত বড় একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়মের অভিযোগ নজরে না আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
একইভাবে মধ্যপ্রদেশে ভূমি লেনদেন নিয়ে ওঠা অভিযোগও দেখিয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা এখনও কঠিন। বিরোধীরা যেমন এসব ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে, তেমনি ক্ষমতাসীনদের প্রতিক্রিয়াও প্রায়শই তুলনামূলক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে—অন্য দলও একই কাজ করেছে, তাই বর্তমান অভিযোগকে বড় করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু এই যুক্তি দুর্নীতিকে বৈধতা দেয় না; বরং জনআস্থাকে আরও ক্ষয় করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নীট পরীক্ষাকে ঘিরে অনিয়ম, পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার ধারাবাহিক ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বেরও প্রশ্ন তোলে। একটি জাতীয় পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা যখন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন কেবল কারিগরি সংস্কার যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দায়িত্ব স্বীকারের সংস্কৃতিও জরুরি হয়ে ওঠে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের কাছে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস টিকে থাকে জবাবদিহির ওপর। কোনো অভিযোগ উঠলেই তা অস্বীকার করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অতীত তুলে ধরা বা সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা—এসব কৌশল সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুর্নীতি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষ তাৎপর্য এই যে, ক্ষমতায় আসার আগে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ছিল অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সেই কারণেই এখন প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানুষ শুধু অতীতের সঙ্গে তুলনা চায় না; তারা দেখতে চায় ঘোষিত নীতির বাস্তব প্রয়োগ।
এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। সাম্প্রতিক কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আবারও প্রমাণ করেছে, শক্তিশালী সাংবাদিকতা এখনও ক্ষমতার অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো সামনে আনতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, এই ধরনের অনুসন্ধান আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। সংবাদমাধ্যম যদি সতর্ক পর্যবেক্ষকের ভূমিকা হারায়, তাহলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির একটি বড় স্তম্ভও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভারতের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দুর্নীতি দমন নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে স্বচ্ছতা, উন্নয়নের সঙ্গে জবাবদিহি এবং জনপ্রিয়তার সঙ্গে নৈতিক দায়িত্ব সমান গুরুত্ব পায়। কারণ কোনো সরকারই কেবল নির্বাচনী সাফল্যের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস অর্জন করতে পারে না। সেই বিশ্বাস টিকে থাকে তখনই, যখন ক্ষমতাসীনরা নিজেদেরও একই মানদণ্ডে বিচার করতে প্রস্তুত থাকে, যা তারা একসময় তাদের পূর্বসূরিদের জন্য দাবি করেছিল।
তাভলিন সিং 

















