যকৃতের রোগ নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ দশকের গবেষণা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং রোগ নির্ণয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে এক নতুন অধ্যাপক পদের নামকরণ করা হয়েছে বিশিষ্ট প্যাথলজিস্ট অধ্যাপক আইলিন উই–এর নামে। বিশ্ববিদ্যালয়টির চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদের এই উদ্যোগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই অধ্যাপক পদ যকৃতের রোগ নিয়ে বহুমাত্রিক গবেষণা, নতুন উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদ্যোগের মূল লক্ষ্য
নতুন অধ্যাপক পদের মাধ্যমে যকৃতের রোগ, ক্যানসার এবং অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার গবেষণায় বিভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞদের একত্রে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং গবেষণার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইলিন উই বলেছেন, মানবদেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গগুলোর একটি হলো যকৃত। এর রোগ নিয়ে গবেষণা বহুমাত্রিক এবং বহু শাখার সমন্বয় ছাড়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই অধ্যাপক পদ এমন গবেষকদের সহায়তা করবে যারা যকৃতের রোগ সম্পর্কে এখনো অজানা অনেক বিষয় উদ্ঘাটনে কাজ করছেন, যাতে রোগীরা আরও উন্নত চিকিৎসা পেতে পারেন।
যকৃত গবেষণায় পাঁচ দশকের অবদান
অধ্যাপক আইলিন উই প্রায় ৫০ বছর ধরে ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইটিস, সিরোসিস এবং যকৃতের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের কারণ, কোষগত পরিবর্তন এবং রোগের অগ্রগতির ওপর গবেষণা করে আসছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বিপাকজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত স্টিয়াটোহেপাটাইটিস শনাক্ত ও মূল্যায়নের কাজেও যুক্ত হয়েছেন। এই প্রযুক্তি রোগের তীব্রতা নির্ণয়, নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণাকে আরও নির্ভুল করতে সহায়তা করছে।
আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
অধ্যাপক আইলিন উই বর্তমানে যকৃতের কোষভিত্তিক রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন পদ্ধতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকদের মধ্যে রোগ নির্ণয়ের ভাষা ও মান একীভূত করা, যাতে রোগীর চিকিৎসা আরও কার্যকর হয়।
তিনি সূক্ষ্ম সূঁচের মাধ্যমে কোষ সংগ্রহ করে রোগ নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই তুলনামূলক কম আক্রমণাত্মক পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো টিউমার বা অস্বাভাবিক কোষ ক্যানসারজনিত কি না, তা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

চিকিৎসা শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার অনুপ্রেরণা
গবেষণার পাশাপাশি আইলিন উই দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বহু বছর ধরে চিকিৎসা শিক্ষার্থী, প্রশিক্ষণরত চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্টদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে চিকিৎসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং দক্ষ চিকিৎসক তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সময় একাধিক সম্মাননা লাভ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, নতুন এই অধ্যাপক পদ শুধু একজন গবেষকের অবদানকে সম্মান জানানো নয়, বরং যকৃতের রোগ নিয়ে আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা, উদ্ভাবনী রোগ নির্ণয় এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে যকৃতের রোগ সম্পর্কে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পথ আরও বিস্তৃত হবে।
যকৃত গবেষণায় পথিকৃৎ এই চিকিৎসকের উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বলেও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















