বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থীর মৌলিক পড়াশোনা ও গণিতের দক্ষতা প্রত্যাশিত মানে নেই—এমন উদ্বেগ এখন শুধু একটি দেশের নয়, বরং উন্নত বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন মূল্যায়ন ও শিক্ষাবিদদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালেও তাদের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ দিকের শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে রয়ে গেছে।
শিক্ষকদের বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর গণিত, বিশ্লেষণধর্মী লেখা কিংবা জটিল পাঠ্যবস্তু বুঝতে উল্লেখযোগ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষার পাঠদানের পাশাপাশি অনেক শিক্ষককে আবারও মৌলিক বিষয় শেখাতে হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে প্রথম বর্ষের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর গণিতের ভিত্তি মাধ্যমিকের নিচের স্তরের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে দীর্ঘ লেখা পড়ে তা বিশ্লেষণ করার সক্ষমতাও কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষকেরা।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে যা উঠে এসেছে

উন্নত দেশগুলোর প্রাপ্তবয়স্কদের দক্ষতা নিয়ে পরিচালিত আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ভাষাগত ও সংখ্যাগত দক্ষতা অত্যন্ত দুর্বল। ধনী দেশগুলোর গড় হিসাবে প্রায় ৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর সাক্ষরতা ও গণিতের দক্ষতা এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা সাধারণত ১০ বছর বয়সী একটি শিশুর কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়।
দেশভেদে এই চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোথাও খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী দুর্বল পারফরম্যান্স করেছে, আবার কোথাও এই হার অনেক বেশি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফলাফল নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
কেন পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। করোনা মহামারির সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। এর প্রভাব এখনো উচ্চশিক্ষায় এসে পড়ছে।
এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় ব্যয়, বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা হ্রাসও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও একটি বড় বিষয় হলো, অনেক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি প্রক্রিয়ায় মান যাচাইয়ের প্রচলিত পদ্ধতি শিথিল হওয়ায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করছে বলে শিক্ষাবিদদের ধারণা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার শিক্ষকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনেক শিক্ষার্থী লেখালেখি, কোডিং কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে এসব প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
এতে প্রকৃত শেখার পরিবর্তে প্রস্তুত করা উত্তর জমা দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা মূল্যায়ন কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাই আবারও তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা নেওয়ার দিকে ফিরছে।
মান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করাই উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত ভর্তি থেকে শুরু করে মূল্যায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্কুল পর্যায়ে মৌলিক শিক্ষা আরও শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, বিশ্লেষণী চিন্তা ও গণিতভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















